(দিনাজপুর২৪.কম) নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে মসজিদে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত নারায়ণগঞ্জের বন্দরের ওমর ফারুক লাশ মঙ্গলবার রাতে দেশে এসেছে। মঙ্গলবার রাত ১০টা ৪০ মিনিটে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের একটি বিমানে ওমর ফারুকের লাশ আনা হয়েছে বলে পরিবার সূত্রে জানা গেছে।

গত ১৫ মার্চ নিউজিল্যান্ডের ক্রাইষ্টচার্চে জুম্মার নামাজের আগ মুহূর্তে সন্ত্রাসী হামলায় আহত ওমর ফারুক চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তিনি বন্দরের রাজবাড়ি এলাকার মৃত আব্দুর রহমানের একমাত্র ছেলে।

ওমর ফারুকের ভগ্নিপতি সারোয়ার হোসেন জানান, সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের একটি বিমানে করে মঙ্গলবার রাত দশটা চল্লিশ মিনিটে ওমর ফারুকের লাশ আসে। পরে বিমান বন্দরে আনুষ্ঠানিকতা সেরে আমরা ওমর ফারুকের লাশ গ্রহণ করে বন্দর নিয়ে আসি।
নিহতের জানাজা বুধবার সকালে অনুষ্ঠিত হবে।

এদিকে বন্দরে ওমর ফারুকের বাড়িতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।স্বজনদের আহজারিতে আকাশ বাতাস ভারি। একমাত্র সন্তান হারিয়ে বাকরুদ্ধ মা রহিমা। স্বামীকে হারিয়ে পাগলপ্রায় স্ত্রী নেহা।

জানা যায়,অসময়ে বাবার মৃত্যুতে পরিবারের হাল ধরেছিল ওমর ফারুক। সংসারে সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতে পাড়ি জমান সুদূর নিউজিল্যান্ডে। ভাগ্য তার সুপ্রসন্ন হয়। নাগরিকত্ব পেয়ে যান সেখানে। দেশে এসে ধুমধাম করে বিয়ে করেন। আবার ফিরে যান চলতি বছরের ১৮ জানুয়ারি। কিন্তু প্রবাসে থাকলেও তার মনটা পড়ে ছিল পরিবারের কাছে। সময় পেলেই মা-বোন ও স্ত্রীর খোঁজ নিতেন।

স্ত্রীকে সতর্ক করতেন যেন সাবধানে থাকে। অনাগত সন্তান যেন মাতৃগর্ভে নিরাপদে থাকে। নানা চিন্তা। স্ত্রী সানজিদা জাহান নেহার সঙ্গে আগত সন্তানকে নিয়ে কতই না স্বপ্ন দেখেন ফারুক। হামলার আগের দিন বৃহস্পতিবার মধ্যরাত ১২টা ১ মিনিটেও স্ত্রী নেহার সঙ্গে কথা বলেন ওমর ফারুক। স্ত্রীর খোঁজ নিয়ে তাকে সাবধানে চলাফেরা এবং নিজের প্রতি খেয়াল রাখার পরামর্শ দেন। সেই সঙ্গে অসুস্থ মায়ের যত্ন নিতে ও ছোট বোনকে দেখে রাখার কথা বলেন। কিন্তু কে জানতো এটাই ফারুকের সঙ্গে নেহার শেষ কথা হবে। তার জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন দুঃসংবাদ দরজায় কড়া নাড়ছে। শুক্রবার জুমার নামাজের সময় নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের একটি মসজিদে সন্ত্রাসী হামলায় গুলিবিদ্ধ হন ওমর ফারুক। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শনিবার রাতে তিনি মারা যান।

ওমর ফারুকের পরিবারে এখন শোকের মাতম। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে ফারুকের মা রহিমা খাতুন পাগলপ্রায়। অনেকটা বাকরুদ্ধ ওমর ফারুকের তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী সানজিদা জাহান নেহা। তার অনাগত সন্তান জন্ম নেয়ার আগেই পিতৃহারা হলো।

নিহত ফারুকের পারিবারিক তথ্যমতে, নারায়ণগঞ্জের বন্দরের রাজবাড়ি এলাকার মৃত আবদুর রহমানের ৪ ছেলেমেয়ের মধ্যে ওমর ফারুক (৩৫) তৃতীয়। বড় দুই বোনের বিয়ে হয়েছে। ছোট বোন এখনো অবিবাহিত। সংসারে সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতে ২০১৫ সালে নিউজিল্যান্ডে যান ওমর ফারুক। সেই দেশে নাগরিকত্ব পাওয়ার পর ছুটিতে দেশে এসে ২০১৭ সালের ২৯ ডিসেম্বর সানজিদা জামান নেহাকে বিয়ে করেন ফারুক। এরপর সবশেষ গত বছরের ১৬ নভেম্বর দেশে এসে চলতি বছরের ১৮ জানুয়ারি নিউজিল্যান্ড যান ফারুক।

ফারুকের স্ত্রী সানজিদা জামান নেহা বলেন, হামলার আগের দিন মধ্যরাত এবং নিউজিল্যান্ড সময় সকাল ৮টায় ফারুক তাকে ফোন করে তার ও পরিবার সদস্যদের খোঁজখবর নেন। সেই সঙ্গে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে নিজের শরীরের প্রতি বিশেষ যত্ন নেয়ার কথা বলেন। এটাই ছিল ফারুকের সঙ্গে নেহার শেষ কথোপকথন।

তিনি জানান,টেলিভিশনে নিউজিল্যান্ডে ক্রাইস্টচার্চে জুমার নামাজের পর মসজিদে সন্ত্রাসী হামলায় ব্যাপক হতাহতের খবর পেয়ে আমরা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠি। এবং সেখানে ফোন করে ওমর ফারুকের খোঁজ নেয়ার চেষ্টা করি। তার রুম মেটের কাছ থেকে জানতে পারি লাঞ্চ ব্রেকের পর ফারুক মসজিদে জুমার নামাজ পড়তে যায়। এরপর কি হয়েছে তার কোনো খোঁজ দিতে পারেনি সে।

পরে নিউজিল্যান্ডে বাংলাদেশের কনসুলারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় ওমর ফারুক আহত অবস্থায় হাসপাতালে আছে। পরের দিন শনিবার সন্ধ্যায় জানতে পারে ওমর ফারুক মারা গেছেন।
ঐ রাতে নিউজিল্যান্ডে যোগাযোগ করে লাশ শনাক্ত করার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তার ভগ্নিপতির বড় ভাই মোশারফ হোসেন।
তাদের দাবি, পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তিটিকে হারিয়ে সংসার চালানোর মতো আর কেউ রইলো না তাদের। -ডেস্ক