লাবণ্য (দিনাজপুর২৪.কম) ব্যাপক আয়োজনের মধ্য দিয়ে ১১ সেপ্টম্বর পালিত হলো দিনাজপুর হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা বাষির্কী। কিন্তু একবারেও স্মরণ করা হলো না হাজী মোহাম্মদ দানেশকে। যার নামে প্রতিষ্ঠিত এ বিশ্বাবদ্যালয় ! এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা হয়তো ভূলেই গেছেন, আর নবীনরা তো জানেইনা কিংবদন্তি কৃষক নেতা হাজী মোহাম্মদ দানেশ। তার জন্ম কোথায়,বাড়ী কথায় কিংবা তার মাজার কথায় ? তাও জানা নেই অনেকের।
দুঃখজনক হলেও সত্য দিনাজপুর গোর-এ-শহীদ বড় ময়দানের এক কোনে অবহেলা আর অযত্নে পড়ে আছে এই ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোরনের নেতা হাজী মোহাম্মদ দানেশের কবর তথা মাজারটি। এই মাজার চত্তরে নেই কোন সাইন বোর্ড কিংবা নাম ফলক। পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার অভাবে জঙ্গলে পরিনত হয়েছে মাজার চত্তরটি। অনেক সময় এই চত্তরে ঘটছে অসামাজিক কার্যক্রম।
রাজনীতিক এই প্রাণ পুরুষের এক ছেলে তিন মেয়ের মধ্যে ছেলে ফারুক দানেশ ও দুই মেয়ে ইতমধ্যে মৃত্যু বরণ করেছেন। এক মেয়ে সুলতানা রেদওয়ানা রানু (৭২) শারীরক ভাবে অসুস্থ।
দিনাজপুরের তথা বাংলাদেশর রাজনীতিক গৌরব, পাক-ভারত উপমহাদেশের বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের নেতা, ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোরনের কিংবদন্তি প্রখ্যাত কমিউনিস্ট নেতা, ভাষা সৈনিক, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক হাজী মোঃ দানেশ। যে নামটি মেহনতি, মুক্তিকামী, শোষিত মানুষের অনুপ্রেরণার প্রতিক। সেই কিংবদন্তি তুল্য এই মানুষটি শুধু দিনাজপুর নয়, এই নেতা দিনাজপুরের গন্ডি পেরিয়ে সারা দেশ তথা সারা উপমহাদেশে শোষিত ও নির্যাতিত মানুষের মুক্তির প্রতিক হিসেবে আবির্ভুত হোন।
এই রাজনৈতিক নেতার নামে দিনাজপুরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যাল। তার গ্রামের বাড়ী দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার সুলতানপুর গ্রামেও রয়েছে আরেকটি কলেজ।এতটুকুতে সন্তুষ্ট নয় তার পরিবারের সদস্যরা ও দিনাজপুরের মানুষ। এই জেলার মানুষের দাবী এই মহান নেতার মুরাল স্থাপন করার।
বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) যুগ্ম মহা সচিব শাহাদৎ হোসেন শাহ বলেন, এই মহান নেতার নামে হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যাল প্রতিষ্ঠিত হলেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দেশ বরেনণ্য এই নেতার জন্ম কিংবা মৃত্যু বাষির্কী কোনটাই পালন করেনা । বিশ্ববিদ্যালয় চত্তরে নেই কোন ভার্স্কায। তিনি আরো বলেন,এই বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন পিএইচ ডি করছেন অনেকে কিন্তু যার নামে এই প্রতিষ্ঠান তাকে নিয়ে কেউ কোন গবেষনা করছেনা। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় চত্তরে রানীতিক এই পুরুষেল ভার্স্কায স্থাপনের দাবী জানান।
হাজী মোহাম্মদ দানেশের নাতি ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার সাবেক উপজেলার চেয়ারম্যান সুলতান ফেরদৌস ন¤্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা পরিবারে সদস্যরা দিনাজপুর গোর-এ-শহীদ বড় ময়দানে নানাকে কবর দেয়ার পক্ষে ছিলামনা। সে সময় সাবেক প্রেসিডেন্ট হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদের সিদ্ধান্তেই নানার কবর সেখানে হয়। একটি সুন্দর মাজারও করা হয়েছে। কিন্তু এর রক্ষনা বেক্ষন নেই।
এই প্রতিবেদকের এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলন, মাজার চত্তরে কোন সাইনবোর্ড না থাকা এবং নাম ফলক ফাকা থাকা কোন ভাবেই মেনে নেয়া যায়না। তিনি বলেন সম্প্রতি সময় তিনি দিনাজপুরে এসে নানার মাজারে সাইনবোর্ড ও নাম ফলক লাগিয়ে যাবেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ গত দু বছর আগে একটি ম্যাগাজিন প্রকাশ করেছে। যাতে হাজী মোহাম্মদ দানেশর এক ছেলেও দুই মেয়ে লেখা হয়েছে। প্রকৃত পক্ষে হাজী মোহাম্মদ দানেশর এক ছেলে ও তিন মেয়ে হবে। এটি সংশোধন ছেয়ে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে লিখিত চিঠি দিলেও সংশোধন করা হয়েছে কি না তা তাকে যানানো হয়নি।
তিনি বরেনণ্য এই নেতার জন্ম ও মৃত্যু বাষির্কী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে আনুষ্ঠানিক ভাবে প্রতি বছর পালন করার অনুরোধ জানান।
হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সলর প্রফেসর রুহুল আমিন বলেন, হাজী মোহাম্মদ দানেশর নামে ওযেব সাইট রয়েছে। আমরা তাঁর প্রাত সম্মান রেখে তাকে স্বরণ করে থাকি।
এ্যাফ্রো এশিয়ার আরেক নেতা স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন স্রষ্টা মজলুম জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খাঁন ভাষাণীর অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহচর হাজী মোহাম্মদ দানেশ এর জন্ম তদানিন্তন বৃটিশ ভারতের প্রাচিনতম জেলা দিনাজপুর এর বোচাগঞ্জ উপজেলার সুলতানপুর গ্রামে ১৯০৩ সালে। পিতার নাম ছিল মৌলভী সালামত উদ্দীন। ১৯২৩ সালে তিনি প্রথম বিভাগে প্রবেশিকা পরীায় উত্তীর্ণ হোন। রাজশাহী কলেজ থেকে বি.এ পাশ করার পর তিনি এক বছর দিনাজপুর জুনিয়র মাদ্রাসায় প্রধান শিকের দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি উচ্চ শিার্থে আলীগড় গমন করেন। সেখানকার মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৩১ সালে এম,এ ও ১৯৩২ সালে এল,এল,বি ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৩৩ সালে দিনাজপুর জজ কোর্টে আইন ব্যবসা শুরু করেন।

১৯৩৮ সালে হাজী মোহাম্মদ দানেশ সক্রিয় রাজনৈতিক জীবনে প্রবেশ করেণ। ঐ বছর তিনি ন্যাপ এর প্রথম সহ-সভাপতি ও পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির সিনিয়র সহ সভাপতি নির্বাচিত হোন। ১৯৫৮ সালে সামরিক আইনজারী ও রাজনৈতিক তৎপরতায় গ্রেফতার করা হয় তাঁকে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে তিনি সক্রিয় ভুমিকা রাখেন। ১৯৭২ সালে তিনি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (লেলীন বাদী) তে যোগদান করেন। তিনি পূর্বেও কমিউনিস্ট আন্দোলনকে মনে প্রাণে ধারণ করেছিলেন।
১৯৭৩ সালের ডিসেম্বর মাসে তিনি অন্যান্য বাম পন্থীদের একত্রিত করে জাতীয় গণমুক্তি ইউনিয়ন গঠন করেন এবং এই সংগঠনের সভাপতি নির্বাচিত হোন। ১৯৭৫ সালে দেশে সকল রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে বাকশাল গঠন করা হলে তিনি বাকশালে যোগদান করেন। এর পূর্বে হাজী দানেশ যখন প্রথম সক্রিয় রাজনৈতিক জীবনে প্রবেশ করেন তখন তিনি কমিউনিষ্ট পার্টির উদ্যোগে গঠিত জেলা কৃষক সমিতির সদস্য হোন।
ভারতের কমিউনিষ্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা কমরেড মুজাফফর আহাম্মদ এর দ্বারা তিনি গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। ১৯৩৮ ও ১৯৪২ সালে কৃষক আন্দোলন গড়ে তোলার অপরাধে ২ বার তাকে কারাবন্দি করা হয়। এই সময়ে হাট বাজারে টোল আদায় করে ও জমিদারী প্রথা উচ্ছেদের দাবীতে তিনি তুমুল আন্দোলন গড়ে তোলেন।
১৯৪২ সালে রংপুরের (বর্তমান নীলফামারী) ডোমারে বঙ্গীয় কিষাণ সম্মেলন অনুষ্ঠানের তিনি ছিলেন প্রধান উদ্যোক্তা। এই সম্মেলনে তিনি নিখিল ভারত কিষাণ সভার সভাপতি নির্বাচিত হোন।
দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের হাজী মোহাম্মদ দানেশ দিনাজপুর-রংপুর ও জলপাইগুড়ি সহ সারা উত্তরাঞ্চলে কৃষকদের এক জঙ্গি আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। উপমহাদেশে এই আন্দোলন ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলন নামে বিখ্যাত হয়ে আছে। পূর্বে ১৯৪৫ সালে হাজী দানেশ মুসলীম লীগে যোগ দিয়েছিলেন।
১৯৪৬ সালে তেভাগা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার কারণে মুসলিম লীগ থেকে বহিস্কৃত হোন। সাথে সাথে তাকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৪৭ সালে তিনি মুক্তি পান। ঐ বছরই তিনি দিনাজপুর এস,এন কলেজে ইতিহাসের অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৫৩ সালে পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক দল গঠিত হলে তিনি ঐ দলের সভাপতি নির্বাচিত হোন। একারণে তাকে গ্রেফতার করা হয়। একই বছরে তিনি মুক্তি পান। ঐ বছরই তিনি দিনাজপুর এস,এন কলেজে যোগদান করেন।
১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের অংশীদার হিসেবে তাঁর দল তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদে ১৪টি আসন লাভ করে। তিনি নিজেও নির্বাচিত হোন। পরর্তীতে যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রিসভা ভেঙ্গেঁ দিলে অন্যান্যদের সাথে তাঁকেও গ্রেফতার করা হয়। ১৯৫৬ সালে তিনি মুক্তি লাভ করেন এবং ১৯৫৭ সালে মাওলানা ভাষানীর ন্যাপ’এ যোগ দেন। তিনি পূর্ব পাকিস্তান ন্যাপ এর সভাপতি নির্বাচিত হোন। ১৯৭৫ সালে বাকশাল সরকারের পতন হলে জাতীয় গণমুক্তি ইউনিয়ন পুনরূজিজ্বিত করেন। তিনি গণতান্ত্রিক পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা।

গণতান্ত্রিক পার্টি জাতীয় ফ্রন্টের শরিক ছিল। এই ফ্রন্ট পরে জাতয়ি পার্টিতে রূপান্তরিত হলে তিনি জাতীয় কৃষক পার্টির প্রধান উপদেষ্টা মনোনিত হয়। একবার তিনি জাতীয় পার্টির টিকিটে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী এই মানুষটি ২৮ জুন ১৯৮৬ সালে ভোর ৪ টা ২৫ মিনিটে ঢাকার পিজি হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন। তিনি মৃত্যুকালে ১ পুত্র ও ৩ কন্যা সন্তন রেখে যান।

পুর্ণ সামরিক মর্যাদায় এই নেতাকে দিনাজপুরে দাফন করা হয়। বর্তমানে দিনাজপুর বড় ময়দানে এই কিংবদন্তি নেতার মাজার বিদ্যমান।
হাজী মোহাম্মদ দানেশ সারাটা জীবনই শোষিত ও মেহনতী মানুষের অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবেন।

দিনাজপুরের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রথমে হাজী মোহাম্মদ দানেশের নামে “হাজী মোহাম্মদ দানেশ কৃষি কলেজ” হিসেবে যাত্রা শুরু করে। বর্তমানে এটি তার নামেই বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এ ছাড়াও তাঁর নামে দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার সুলতানপুরে রয়েছে আরও একটি কলেজ।