(দিনাজপুর২৪.কম) শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বজুড়ে এখন ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব চলছে। এশিয়ায় ডেঙ্গু মহামারি পর্যায়ে পৌঁছেছে। গত ২০ জুলাই পর্যন্ত আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ফিলিপাইনে ৬২২ জনের বেশি মৃত্যু হয়েছে ডেঙ্গুতে। আর দেড় লক্ষাধিক মানুষ আক্রান্ত হয়েছে।

গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯৮ শতাংশ কিংবা প্রায় দ্বিগুণ। ফলে ডেঙ্গুকে জাতীয় মহামারি ঘোষণা করেছে ফিলিপাইন। হন্ডুরাসে গত ৫০ বছরের তুলনায় এ বছর বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছে। চলতি বছর ২৮ হাজারের বেশি মানুষ সেখানে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে।

এর মধ্যে মারা গেছে ৫৪ জন। সিঙ্গাপুরে আট হাজার আক্রান্ত ও ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ৩২ হাজারেরও বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত এবং ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।

১৯৫০ সালে থাইল্যান্ডে প্রথম ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। এরপর ১৯৭০ সালে মাত্র ৯টি দেশে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ে। এরপর পরিস্থিতির আর উন্নতি হয়নি। অপরিকল্পিত নগরায়ণ আর যথাযথ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব। ২০১৯ সালে ডেঙ্গু শতাধিক দেশে ছড়িয়ে পড়েছে।

এক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ৩৯ কোটির বেশি মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়। অপর এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১২৮টি দেশের ৩৯০ কোটি মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

এই দুটো পরিসংখ্যান থেকে বর্তমান বিশ্বের জন্য ডেঙ্গু কতটা হুমকি সৃষ্টি করেছে তাবিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল।

২০১৬ সালে এসব অঞ্চলে আক্রান্ত হয় প্রায় ৩০ লাখ মানুষ। ২০১৫ সালে কেবল যুক্তরাষ্ট্রেই আক্রান্ত হয় ২০ লাখের বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের এত উন্নত চিকিৎসাসেবার পরও মারা গেছে প্রায় হাজারেরও বেশি মানুষ।

বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণহীন। প্রতিদিন রেকর্ড গড়ছে ডেঙ্গু। গত বছর যেখানে সর্বসাকুল্যে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছিল মাত্র ১০ হাজার, সেখানে চলতি মাসের প্রথম সাতদিনে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে ১৫ হাজার ৮৭৯ জন। যা গত মাসের আক্রান্তদের সামান্য কম।

এদিকে কয়েক মাস ধরে আঘাত হানা ডেঙ্গু মোকাবিলার লক্ষ্যে ঢাকা থেকে গ্রামে ফেরা মানুষের প্রতি বেশ কয়েকটি নির্দেশনা দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। বলেছে, ঘর ও আশপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে। কোথাও স্বচ্ছ পনি যেন জমে না থাকে এবং সার্বক্ষণিকভাবে নিজেকে সতর্ক থাকার বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছে।

এদিকে গতকাল বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম।

অন্যদিকে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন দেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতিকে অত্যন্ত সংকটাপন্ন উল্লেখ করে বলেন, যদি কুরবানির বর্জ্য, পানি, রক্ত ইত্যাদি অপসারণ না করা হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।

তাই এই কাজে সিটি কর্পোরেশনকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। এ সময় তিনি সরকারি সব সংস্থা ও জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে দেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

দেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতি মহামারি নয়
দেশের চলমান ডেঙ্গু পরিস্থিতিকে মহামারি মানতে নারাজ স্বাস্থ্যমন্ত্রী। গতকাল বুধবার দুপুরে রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গুরোগ বিষয়ে বৈজ্ঞানিক সেমিনারে অংশ নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, দেশে ডেঙ্গুর বর্তমান পরিস্থিতিকে মহামারি বলব না, স্বাভাবিকও বলব না। তবে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। ঈদের সময় রোগীদের সেবা দিতে সবার ছুটি বাতিল করা হয়েছে। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা চলবে।

এছাড়া বেসরকারি হাসপাতালগুলোকেও অনুরোধ করব তারা যেন সেবা কমিয়ে না দেয়।তিনি বলেন, মশা মারার দায়িত্ব আমাদের নয়। যখন কোনো মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে আসবে, তাদের চিকিৎসার দায়িত্ব আমাদের। শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে এক হাজার বেড প্রস্তুত।

মহাখালীর শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট, পঙ্গু হাসপাতালের নতুন ৫০০ বেডের যে ভবন হচ্ছে, সেটা এবং সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের বর্ধিত ভবন ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

জনস্বাস্থ্য সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক ডা. ফয়জুল হাকিম বলেন, দেশের এই পরিস্থিতিতে দায়িত্বে অবহেলার জন্য স্বাস্থ্যমন্ত্রী সিটি মেয়রদের পদত্যাগ করা উচিত। তাদের শাস্তির আওতায়ও আনা দরকার।

দেশের এই পরিস্থিতিকে রাজনৈতিকভাবে না দেখে জাতীয় দুর্যোগ ঘোষণা করে সবাইকে নিয়ে মোকাবিলা করতে সরকারকে আরো উদ্যোগী হতে হবে। খোলা মাঠ কিংবা বিভিন্ন ভবনে শুধু ডেঙ্গুর জরুরি চিকিৎসাসেবা প্রদানের ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি।

মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে
প্রতিদিন মৃত্যুও সংখ্যা বাড়ছে। সরকারি হিসাবে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা ২৩ জন (চলতি মাসে তিনজন, জুলাইতে ১৫ জন, জুনে তিনজন এবং এপ্রিলে দুইজন) বলা হলেও বেসরকারি হিসাবে এর সংখ্যা তিনগুণের বেশি হবে বলে বলা হচ্ছে।

যার মধ্যে বেসরকারি হাসপাতালেই ১৯ জন মারা গেছে। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসক, আমলা, গৃহবধূ ও শিশুসহ সব বয়সের রোগী প্রায় প্রতিদিনই মারা যাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি রোগী মারা গেছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে।

গতকাল বুধবারও ঢাকাসহ সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে। গতকাল বুধবার রাজধানীর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মুন্সিগঞ্জের আওলাদ হোসেন (৩২) নামে একজনের মৃত্যু হয়েছে।

এ নিয়ে ঢামেকে ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়াল ১৮ জনে বলে জানিয়েছেন ঢামেক হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. নাছির উদ্দীন।

এদিকে রাজধানীর ইউনাইটেড হসপিটালের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় সরকারি তিতুমীর কলেজের ছাত্র মেহেদী হাসান (২৫) ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে গতকাল দুপুরে মারা যান। মেহেদী অর্থনীতি বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র ছিলেন। মেহেদীর বন্ধু ওয়াহিদ জানায়, মেহেদীর জ্বর কমছিল না।

রক্তের প্লাটিলেটও খুব কম ছিলো। বাংলাদেশ মেডিকেলে চারদিন ভর্তি ছিলো। অবস্থার অবনতি হলে তাকে ইউনাইটেড হাসপাতালে এনে ভর্তি করা হয়। সেখানেই গতকাল বিকেলে মারা যান মেহেদী। আগামীকাল (আজ) বৃহস্পতিবার কুমিল্লার মুরাদনগরে নিজ গ্রামে মেহেদীর দাফন হবে।

এদিকে গতকাল সকালে ফরিদপুরে আবদুল জলিল সরদার নামে এ কৃষকের মৃত্যু হয় ডেঙ্গুতে। এই নিয়ে ফরিদপুর মেডিকেলে ডেঙ্গুতে মৃত্যু সংখ্যা দাঁড়াল তিনজনেম আর জেলায় নিহতের সংখ্যা পাঁচজন।

দেশে বর্তমান ডেঙ্গু পরিস্থিতি
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন্স সেন্টার অ্যান্ড কন্ট্রোল রুমের তথ্য মতে, গতকাল বুধবার পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে দুই হাজার ৪২৮ জন। এদের মধ্যে ঢাকায় ভর্তি আছে এক হাজার ২৭৫ জন।

এদের মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১৬২ জন। মিটফোর্ড হাসপাতালে ১৩৮ জন। সরকারি শিশু হাসপাতালে ৪৪ জন, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৯৭ জন। বারডেম হাসপাতালে হয়েছে ২৫ জন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩৫ জন। রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স হাসপাতালে ৪২ জন, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৩৯ জন, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ১১০ জন এবং সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ৪৫ জন। এ ছাড়াও বিভিন্ন বেসকারি হাসপাতালে ৪২৬ জন ভার্তি আছে এবং ঢাকার বাইরে বিভিন্ন হাসপাতাল ক্লিনিকে ভর্তি আছে এক হাজার ১৫৩ জন।

চলতি বছরের পয়লা জানুয়ারি থেকে গতকাল বুধবার পর্যন্ত সারাদেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে ৩২ হাজার ৩৪০ জন। ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্যে এখনো হাসপাতালে রয়েছে আট হাজার ৭০৭ জন। চিকিৎসাসেবা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ২৩ হাজার ৬১০ জন।

আক্রান্তদের মধ্যে শুধু ঢাকায় আক্রান্ত হয়েছে ২৩ হাজার ৪৭৭ জন। হাসপাতালে আছে পাঁচ হাজার ৩৮৯ জন। আর বাড়ি ফিরেছে ১৮ হাজার ৬৫ জন। শুধু বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে ১০ হাজার ৯৩১ জন। এদের মধ্যে এখনো হাসপাতালে আছে দুই হাজার ১০৩ জন।

আর বাড়ি ফিরেছে আট হাজার ৮০৯ জন। ঢাকার বাইরে এ পর্যন্ত চিকিৎসা নিয়েছে আট হাজার ৮৬৩ জন । এদের মধ্যে এখনো আছে তিন হাজার ৩১৮ জন। আর বাড়ি ফিরেছে পাঁচ হাজার ৫৪৫ জন। শুধু আগস্ট মাসের দিনে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে ১৫ হাজার ৮৭৯ জন।

ঢাকা শহর ব্যতীত ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন জেলায় ২৯৯, চট্টগ্রাম বিভাগে ১৮৭, খুলনা বিভাগে ১৮৬, রংপুর বিভাগে ৮৭, রাজশাহী বিভাগে ১২৮, বরিশাল বিভাগে ১৫৪, সিলেট বিভাগে ৩৪ ও ময়মনসিংহ বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে মোট ৬৯ জন ভর্তি হন। -ডেস্ক