(দিনাজপুর২৪.কম): রৌমারীতে আমগর এলাকায় এহন কোনো কাম নাই। কামলা নিব এরম গেরস্থও নাই। তাই  কামলা দিবার যাইতেছি কিশোরগঞ্জে। ২০ থেকে ২৫ দিন একনাগারে কামলা দিয়া ৬ থেকে ৭ হাজার ট্যাহা কামাই অবো। তারপর বাইত্তে আইসা কিছুদিন রেস্ট (বিশ্রাম) নিয়া আবার ছুইটা যামু অন্য হানে। এবা কইরা বছরে ৬ মাস আমরা বাইরে কামলা দেই। যা কামাই হয় তা দিয়া আমগর বউ পোলাপানের খরচ চলে।

ওই শ্রমিক দলের সঙ্গে কাজ করতে যাচ্ছেন মোরতুজ আলী (২০) নামে এক শিক্ষার্থী। সদ্য অনুষ্ঠিত হওয়া এসএসসি পরীক্ষায় টাপুরচর উচ্চ বিদ্যালয় পরীক্ষাকেন্দ্র থেকে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন তিনি। মোরতুজ আলী বলেন, ‘ধান কাটবার যাচ্ছি কিশোরগঞ্জ জেলায়। ওই হানে এখন পুরোদমে ধানকাটা শুরু হইচে। ২০ থেকে ২৫ দিন ধান কাটার কামলা দিয়ে ট্যাহার যোগার করব। পরীক্ষার রেজাল্ট হওয়ার পর কলেজে ভর্তি হতে অনেক ট্যাহা লাগবো। ওই ট্যাহার জন্যই কাম করবার যাইতেছি।’

রৌমারী উপজেলার পাখিউড়া গ্রামের দরিদ্র তোতা মিয়ার ছেলে মোরতুজ আলী। তার সঙ্গে আরো ৫ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। যারা সবাই এবার এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। তার মধ্যে মোল্লারচরের মমিনুল ইসলাম (২০)। তার বাবা ময়েজ উদ্দিনও একজন দিনমজুর। ৩ ভাইবোনের মধ্যে মমিনুলই বড়। ছোট এক ভাই ও এক বোনও স্কুলে পড়ে। নিজের ও ভাইবোনের লেখাপড়ার খরচ যোগানোর জন্য তিনি মাঝে মাঝেই বিভিন্ন জেলায় কাজ করার জন্য ছুটে যান।

আব্দুল বাতেন নামের এক দিনমজুর বলেন, ‘আমরা রৌমারীর শ্রমিকরা যদি কিশোরগঞ্জ আর কুমিল্লা ধান কাটতে না যাই তাহলে ওখানকার মানুষ খুবই বিপদে পড়ে। টাঙ্গাইল ও নারায়ণগঞ্জে ধান কাটা শুরু হবে আর কিছু দিন পরে। এই ফাঁকে আমরা ওই দুই জায়গায় কাজ করবো। গত ১৫ দিন আগে বিক্রমপুরে আলু তোলার কাজ করেছি।’

মজিবর রহমান নামের এক শ্রমিক বলেন, ‘আমগো রৌমারীতে কোনো কাজ নাই। কাজ দেওয়ার মতো কোনো মানুষও নাই। তাই আমগর কামলা দিবার যাওন লাগে অন্য জেলায়। তবে কামলা দিবার যাইয়া আমগর খুব কষ্ট হয় থাকা আর খাওয়া নিয়া। আমগর রাতে কাটে কোনো স্কুলের বারান্দায়।’

ওইসব শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের সবার বাড়ি রাজীবপুর উপজেলার বামনেরচর, মোল্লারচর, বোয়ালমারী ও বেহুলার চরে। এসব শ্রমিকদের বাড়ি রৌমারী হলেও কিশোরগঞ্জ, কুমিল্লা, টাঙ্গাইল, বিক্রমপুরসহ বিভিন্ন জেলায় কোন সময় কোন কৃষি কাজ হয় তারা বলে দিতে পারে।

সহিবর রহমান নামে একজন বলেন, ‘বাইত্তে বউ পোলাপানের জন্য খালি চাইল কিনা দিয়া আইছি। যে চাইল দিছি তা ১০ দিনের ওপর যাবো না। তহন ধারকর্জ কইরা সংসার চালাইবার কইছি। আমার মতো একই অবস্থা ওদের সবারই।’

ব্রহ্মপুত্র নদ বিচ্ছিন্ন উপজেলার ৬ ইউনিয়নে প্রায় অর্ধশত চরাঞ্চল রয়েছে। ওই সব চরের মানুষ অধিকাংশই দিনমজুর। যাদের সংসারের খরচ যোগাতে হয় দু’হাতের ওপর ভর করে। বর্তমানে উপজেলার চরজনপদগুলোতে কোনো পুরুষ মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না। কেননা তারা সবাই এখন কাজের জন্য দেশের বিভিন্ন জেলায় অবস্থান করছে। সংশ্লিষ্ট এলাকার ইউপি চেয়ারম্যানরা জানান, তাদের এলাকার শ্রমিকরা এখন বিভিন্ন জেলায় ছুটে গেছে।

রৌমারী উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মজিবর রহমান বঙ্গবাসী জানান, তার এলাকার ৮০ ভাগ মানুষ দিনমজুর শ্রেণির। যারা শ্রম বিক্রি করে সংসারের খরচ যোগায়। বর্তমানে তার এলাকার কমপক্ষে ১৫ হাজার শ্রমিক কৃষি কাজের জন্য এলাকা ছেড়ে চলে গেছে। -ডেস্ক