(দিনাজপুর২৪.কম) অপরাধের সঙ্গে যে বা যারাই জড়িত থাকুক না কেন তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি কাউকে ছাড় দেয়া হবে না জানিয়ে এসব অপরাধীরা বাঁচাতে এমপিরা যেন সহযোগিতা করতে না যান, সে বিষয়ে নির্দেশও দিয়েছেন। গতকাল সংসদ অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে বক্তৃতাকালে তিনি এ নির্দেশ দেন। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে এ সংক্রান্ত সম্পূরক প্রশ্নটি উত্থাপন করেন বিএনপির সংসদ সদস্য মো. হারুনুর রশীদ। এ সময় দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াহিদা খানমের ওপর হামলার ঘটনার নিন্দা জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, এমপিদের কাছে আমার অনুরোধ থাকবে, তারা যেন অপরাধীদের রক্ষার চেষ্টা না করেন। অপরাধ যে করে ও অপরাধীকে যারা রক্ষা করে তারা সমানভাবে দোষী। ইউএনও ওয়াহিদা খানমের ওপর হামলার পেছনের কারণ উদ্‌ঘাটনের পাশাপাশি হামলায় মদতদাতাদেরও খুঁজে বের করে শাস্তি নিশ্চিতের আশ্বাস দিয়ে বলেন, অপরাধীরা কেউ ছাড় পাবে না।

অপরাধী আমার চোখে অপরাধীই। সে কোন্‌ দলের কে বা কি সেটা আমি কিন্তু বিচার করি না। অপরাধী যদি আমার দলেরও লোক হয়, সমর্থক হয় তাকেও আমি ছাড়ি না, ছাড়বো না- এটাই হলো আমার নীতি। অপরাধীরা ঠিকই শাস্তি পাবে। মাঠ প্রশাসনের যারা এতো আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করেছে তাদেরকে এইভাবে আঘাত করে এটা তো কখনো গ্রহণযোগ্য না। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইতিমধ্যে ইউএনও’র ওপর হামলার ঘটনা তদন্ত করে দোষীদের কিন্তু গ্রেপ্তার করা হয়েছে, গ্রেপ্তার করা হচ্ছে এবং বিষয়টা কি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। শুধু চুরি না এর সঙ্গে আরো কি কি ঘটনা থাকতে পারে সেগুলোও কিন্তু যথাযথভাবে দেখা হচ্ছে। হামলার পর সরকার থেকে ইউএনও ওয়াহিদা খানমকে হেলিকপ্টার করে ঢাকায় এনে দ্রুত উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি আগেই বলেছি অপরাধী আমার চোখে অপরাধী। সে কোন্‌ দলের কে, কি আমি কিন্তু সেটা বিচার করি না, সেটা আপনারা দেখেছেন। অপরাধী যেই হোক, আমার দলের লোক হলেও ছাড়ি না, ছাড়বো না। সেই নীতি নিয়েই আমি চলছি। ইতিমধ্যে যারা ধরা পড়েছে, তদন্ত করা হচ্ছে। পাশাপাশি আরো তদন্ত করা হচ্ছে যে এই ঘটনার মূলে কি আছে। কেন এই ধরনের ঘটনা ঘটলো? করোনাভাইরাসসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কাজের প্রশংসা করে সংসদ নেতা আরো বলেন, যারা এতো আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করেছে তাদেরকে এইভাবে আঘাত করে এটা তো কখনো গ্রহণযোগ্য না। সম্পূরক প্রশ্ন করতে গিয়ে বিএনপি’র হারুনুর রশীদ প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কাছে উত্তর চাইলেই শুধু আমাদের পেছনের অতীত নিয়ে কথা বলেন। ১৪ বছর ধরে তো বিএনপি ক্ষমতায় নেই। আওয়ামী লীগই ক্ষমতায়। এখন বর্তমান নিয়ে, ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা কথা বললে আমার মনে হয় বেশি ভালো হবে। এমন সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, উনি (এমপি হারুন) বলছেন, অতীত টেনে কথা বলে কেন? কারণ অতীত থেকে শিক্ষা নিয়েই আগামী দিনের চলার পথ নির্দিষ্ট করতে হবে, নইলে তো শিক্ষা হয় না। যে কারণেই অতীতকে স্মরণ করতে হয়। ১৯৯১ সালে ঘূর্ণিঝড়ের কথা আমি বলেছি। সেই ঘূর্ণিঝড়ের তিক্ত অভিজ্ঞতা আমরা তো দেখেছি। কত অবহেলার শিকার ছিল এ দেশের মানুষ। ঠিক ১৯৭০ সালে ঘূর্ণিঝড়ের পর যে রকম মানুষ অবহেলিত ছিল, বিএনপি’র আমলেই তাই হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে সংসদ নেতা আরো বলেন, ওই সময় (৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়) আমরা বিরোধী দলে ছিলাম। বিরোধী দলে থেকে আমরাই আগে সেই দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলাম। তারপরে সরকার গিয়েছিল। সরকার (বিএনপি) তো ঘুমাচ্ছিল। আর এই পার্লামেন্টে বলেছিল যত মানুষ মরার কথা ছিল ততো মানুষ মরে নাই। এটা বিএনপি আর খালেদা জিয়ার বক্তব্য ছিল। এটাই হলো দুর্ভাগ্য। আমি ওটাই বলবো অতীতকে স্মরণ করতে হবে তো। সেখান থেকে শিক্ষা নিতে হবে।

বিএনপি’র অপর সংসদ সদস্য গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ প্রশ্ন করতে গিয়ে বলেন, সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যার পর শুনেছিলাম বেডরুম পাহারা দেয়ার দায়িত্ব আমাদের নয়। বেডরুম নয়, নিজের দেশ আর দেশবাসীকে পাহারা দেয়ার দায়িত্বটা কার? এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কথাটা তো বাস্তব। এভাবে ঘরে ঘরে, বেডরুমে বেডরুমে কেউ পাহারা দিতে পারে না। তারপরও আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের জন্য এবং দেশে যাতে এ ধরনের ঘটনা না ঘটে তার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সব সময় সজাগ রয়েছি, ব্যবস্থা নিচ্ছি। তিনি বলেন, ইউএনও ওয়াহিদা খানমের ক্ষেত্রে যেটা ঘটেছে তা অত্যন্ত দুঃখজনক। বাড়ির ভেতরে ঢুকে এভাবে আক্রমণ করা বা হাতুড়ি দিয়ে পেটানো। চোর ঢুকে চুরি করতে পারে, কিন্তু এভাবে একজন সরকারি কর্মচারীর ওপর হামলা করা এটা অত্যন্ত গর্হিত কাজ এতে কোনো সন্দেহ নেই। এর বিরুদ্ধে আমরা যথাযথ ব্যবস্থা নিচ্ছি। বিএনপি দলীয় এমপি’র সম্পূরক প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী এ সময় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা ও পরবর্তীতে সরকার কর্তৃক খুনিদের রক্ষার চেষ্টার কথা তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশে অতীতে কী ঘটনাটা না ঘটেছে? পঁচাত্তরের ১৫ই আগস্ট তো ঘরে ঢুকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তখন তিনি রাষ্ট্রপতি ছিলেন- তার গোটা পরিবারকেই হত্যা করা হয়েছে। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর সেই খুনিদের ইনডেমনিটি দিয়ে বিচারের হাত থেকে মুক্তি দেয়া হয়েছে। সেই খুনি ক্রিমিনালদের যখন প্রশ্রয় দেয়া হয়, মানসিকভাবে সেই দেশের মানুষের কী রকম চরিত্র হতে পারে? সেটাই বিবেচ্য বিষয়। সেখান থেকে একটা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা, ডিসিপ্লিনে নিয়ে আসা এবং অন্যায়কারীদের যেন শাস্তি হয়, বিচার হয় সেই ব্যবস্থা- এটাই সব থেকে বড় কাজ। ঘটনা যেকোনো সময় ঘটতে পারে। কিন্তু সেই ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে আমরা সরকারের পক্ষ থেকে যারা অপরাধী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছি কিনা, সেটাই হচ্ছে বড় প্রশ্ন। সংসদ নেতা বলেন, যে দেশে খুনিদের পুরস্কৃত করা হয় দূতাবাসে চাকরি দিয়ে, যে দেশে অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়া হয়েছে। দেশটার এমন অবস্থা ছিল। সেই দেশটাকে ডিসিপ্লিনে ফিরিয়ে আনা, সেই দেশকে নিয়ন্ত্রণে এনে নিয়মমাফিক চালানো খুব কঠিন একটা দায়িত্ব। সেই দায়িত্বটা তো আমরা সরকারের আসার পর পালন করে যাচ্ছি।

সকালে উঠে জায়নামাজ খুঁজি, নিজে চা বানিয়ে খাই: জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য ফখরুল ইমামের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, প্রশ্নকর্তা বলেছেন সকালে উঠে কী খুঁজি? সকালে উঠে আমি প্রথমে জায়নামাজ খুঁজি। সকালে উঠেই আগে নামাজ পড়ি। নামাজ পড়ার পরে কোরআন তেলাওয়াত করি। তারপরে এক কাপ চা নিজে বানিয়ে খাই। চা বানাই, কফি বানাই বা যা বানাই, নিজে বানিয়েই খাই। আমার ছোট বোন (শেখ রেহানা) থাকলে সে আর আমি, যে আগে ওঠে সে বানায়। এ প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, এখন আমার মেয়ে পুতুল আছে (সায়মা ওয়াজেদ হোসেন), সে ঘুম থেকে আগে উঠলে সেই বানায়। আমরা নিজেরাই করে খাই। তার আগে বিছানা থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গে নিজের বিছানাটাও গুছিয়ে রাখি নিজের হাতে। এরপর বইসহ যা পড়ার পড়ি। তবে আর একটা কাজ করি এখন, গণভবনে একটা লেক আছে সেখানে হাঁটতে যাই, হেঁটে যখন লেকের পাশে বসি তখন ছিপ নিয়ে বসে মাছও ধরি। পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শিক্ষা ও আদর্শ নিয়ে নিজেদের পথ চলার কথা তুলে ধরে তার কন্যা শেখ হাসিনা বলেন, আমার বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শিক্ষা ও নির্দেশ ছিল- রিকশাওয়ালাকে ‘আপনি’ করে কথা বলতে হবে। ড্রাইভারকে ‘ড্রাইভার সাহেব’ বলতে হবে। আর কাজের লোকজন তাদের কখনো হুকুম দেয়া যাবে না। তাদের সঙ্গে সম্মান করে, ভদ্রভাবে চাইতে হবে। বাবা শুধু বলেছেন তা নয়, শিক্ষাও দিয়ে গেছেন। সেই দিক থেকে আমি মনে করি, আমাদের সকলেরই গরিব দেখলে, ভালো পোশাক না পরলে তাকে অবহেলা করতে হবে- আমার কাছে সেটা না। আমাদের কাছে সকলে সমান সমাদর পায়। বরং যাদের কিছু নেই তাদের দিকে আমরা একটু বেশি নজর দেই, দৃষ্টি দেই। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে চলি, আমরা ছোটবেলা থেকে সেভাবেই শিক্ষা নিয়েছি। আমি প্রধানমন্ত্রী হতে পারি, এখনো বাড়িতে যে ছোট কাজের মেয়ে আছে বা যারাই আছে, কারো কিছু যদি কখনো এক গ্লাস পানিও চাইতে হয়, যতদূর পারি নিজেরা করে খাই। তবুও যদি চাইতে হয়, তাদের জিজ্ঞেস করি আমাকে এটা একটু দিতে পারবে? এই শিক্ষা নিয়ে আমরা এসেছি, এটা এখনো আমরা মেনে চলি। এটা আমার বাবারই শিক্ষা। সরকারি দলের সাবেক চিফ হুইপ উপাধ্যক্ষ আবদুস শহীদের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের কোনো মানুষ গৃহহীন থাকবে না, এটা আমাদের সরকারের সিদ্ধান্ত। এ দেশের একটি মানুষও গৃহহারা থাকবে না। -ডেস্ক