(দিনাজপুর২৪.কম) বিশ্বসম্প্রদায়ের ব্যর্থতায় জেনোসাইডের শিকার লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে যে বাংলাদেশ, সেই দেশও রোহিঙ্গাদের ওপর মানবতাবিরোধী অপরাধ করে থাকতে পারে বা ভবিষ্যতে করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতে (আইসিসি) করা এক আবেদনে ওই আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের তুলাতলি গ্রাম থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ৮৬ জন রোহিঙ্গার পক্ষে যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি আইনজীবীদল তাদের আবেদনে ওই আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন এবং ভাসানচরে স্থানান্তর নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেনের সাম্প্রতিক কিছু বক্তব্যের অংশবিশেষ উল্লেখ করে আইসিসির কাছে আবেদনে ওই আইনজীবীদল আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, মিয়ানমারে ফিরে যেতে বাধ্য করতে রোহিঙ্গা শিবিরে প্রতিকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হচ্ছে।

কক্সবাজারে অমানবিক পরিস্থিতিতে বসবাস, রোহিঙ্গা শিশুর জন্ম নিবন্ধন না করা, রোহিঙ্গাদের সঙ্গে বাংলাদেশিদের বিয়ের ওপর সরকারি নিষেধাজ্ঞা, আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ও অবাধ চলাফেরার সুযোগ না দেওয়া, জোরপূর্বক মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো এবং ভাসানচরে স্থানান্তর করার উদ্যোগকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই আইনজীবীদের মতে, বাংলাদেশ এরই মধ্যে এগুলোর বেশ কয়েকটি করে থাকতে পারে বা ভবিষ্যতে করতে পারে। রোহিঙ্গাদের গণবাস্তুচ্যুতির পূর্ণ তদন্ত শুরু করার অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে এ বিষয়ও আমলে নিতে আইসিসির প্রাক-বিচারিক আদালত-৩-এর কাছে গত ২৩ অক্টোবর আবেদন করা হয়েছে।

আইসিসির কৌঁসুলি ফেটু বেনসুডা মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের গণবাস্তুচ্যুতির পূর্ণ তদন্ত শুরু করার অনুমতি চেয়ে আইসিসিতে যে আবেদন করেছিলেন সে বিষয়ে ক্ষতিগ্রস্ত বা তাদের আইনি প্রতিনিধিদের স্বেচ্ছায় মতামত জানানোর শেষ সময় ছিল গতকাল সোমবার।

জানা গেছে, গতকাল পর্যন্ত বেশ কিছু আবেদন বা অভিমত জমা হয়েছে আইসিসিতে। সেগুলোর মধ্যে আইসিসির কৌঁসুলির আবেদনের পক্ষে যুক্তি যেমন আছে, তেমনি কিছু ভিন্নমতও আছে। মিয়ানমার সরকারের প্রতিনিধি নয় বলে দাবি করা একাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান আইসিসিতে তাদের আবেদনে কার্যত মিয়ানমার সরকারের দৃশ্যমান অবস্থানই তুলে ধরেছে।

রোহিঙ্গাদের ‘বিদেশি’ হিসেবে ইঙ্গিত করে সেসব আবেদনে বলা হয়েছে, তাদের মিয়ানমার থেকে গণবাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আসার কারণ নির্যাতন-নিপীড়ন নয়। পূর্ণ তদন্ত শুরু করতে আইসিসির কৌঁসুলির আবেদনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রাক-বিচারিক আদালত-৩-এর বিচারকরা এসব আবেদনসহ সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে রায় দেবেন।
তুলাতলির ক্ষতিগ্রস্ত রোহিঙ্গাদের পক্ষে লন্ডনভিত্তিক আইনজীবী মেগান হার্স্ট ও জেমস কির্ক মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের গণবাস্তুচ্যুতির কারণ অনুসন্ধানে আইসিসির কৌঁসুলিকে পূর্ণ তদন্তের অনুমতি দেওয়ার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছেন।

আইসিসির কাছে আবেদনে তাঁরা বলেছেন, ‘সম্ভাব্য সব হোতাকে চিহ্নিত করার সুযোগ তদন্তে থাকা উচিত। প্রাথমিক দৃষ্টি থাকবে অবশ্যই মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর দিকে। তবে ওই বাহিনীকে অপরাধ করতে যারা সহযোগিতা করেছে, তাদের ব্যাপারেও অবশ্যই তদন্ত হতে হবে। একইভাবে, রোহিঙ্গাদের সহায়তা করা বাংলাদেশের কর্মকর্তা ও সংস্থাগুলো, যারা অনিরাপদ প্রত্যাবাসন বাস্তবায়নে ক্রমেই অসদ্ব্যবহার করছে তাদের বিষয়েও তদন্ত হওয়া উচিত। সম্ভাব্য এসব অপরাধ চিহ্নিত করতে তদন্তের সুযোগ রাখার বিষয়টি আদালতের লক্ষ্য হওয়া উচিত। ’

মিয়ানমার আইসিসিকে সহযোগিতা করবে না এবং অনেক বছরেও অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা যাবে না—এমন আশঙ্কা ও চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও তুলাতলির ক্ষতিগ্রস্ত রোহিঙ্গারা তদন্ত চায় বলে আদালতকে জানিয়েছেন তাদের প্রতিনিধিত্বকারী আইনজীবীরা। তাঁরা আরো জানান, অপরাধের শিকার ও ক্ষতিগ্রস্ত রোহিঙ্গারা আইসিসির কৌঁসুলির তদন্তের পরিসর বিস্তৃত করার পক্ষে মত দিয়েছে।

আইনজীবীরা আবেদনে বলেছেন, তুলাতলি গ্রামের রোহিঙ্গাদের নিয়েও তদন্ত হতে পারে। বাংলাদেশে আশ্রিত মিয়ানমারের তুলাতলি গ্রামের রোহিঙ্গাদের বেশির ভাগই ২০১৭ সালে এ দেশে আশ্রয় নিলেও তাদের ওপর ২০১০ সাল থেকেই গুরুতর অপরাধ সংঘটিত হচ্ছিল। রোহিঙ্গাদের দেশছাড়া করার পরিকল্পনা যে মিয়ানমারের আগেই ছিল, তারও কিছু দালিলিক প্রমাণ দেওয়া হয়েছে আবেদনের সঙ্গে।

আইনজীবীরা ২০১০ সাল থেকে রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত অপরাধের পাশাপাশি আইসিসির কৌঁসুলির পূর্ণ তদন্ত শুরু করার আবেদন জানানোর (এ বছরের ৪ জুলাই) পর থেকে সংঘটিত অপরাধগুলোও তদন্তের সুযোগ দেওয়ার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছেন। তাঁরা বলেছেন, মিয়ানমারে এক লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে অবৈধভাবে আটক রাখা হয়েছে। যারা কেন্দ্রের বাইরে আছে তাদেরও চলাফেরার স্বাধীনতা নেই। এ বছরের মাঝামাঝি মিয়ানমার সরকার রাখাইন রাজ্যে মোবাইল ডাটা সেবা বন্ধ করে দেয়। বাংলাদেশে আশ্রিত তুলাতলির রোহিঙ্গাদের এখন সবচেয়ে বড় চিন্তা তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো বা ভাসানচরে স্থানান্তর নিয়ে।

আবেদনে বলা হয়েছে, “রোহিঙ্গাদের অনিরাপদে মিয়ানমারে ফিরতে বাধ্য করা হলে তাতে অবশ্যই ‘জোরপূর্বক অপসারণের মানবতাবিরোধী অপরাধ’ সংঘটিত হবে, যা আদালতের বিচারিক এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে। ‘প্রকৃত ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও’ ভাসানচরে গণস্থানান্তর করা হলে তা-ও অপরাধ হতে পারে। এ কারণে বিষয়টি নিবিড়ভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে। ”

সরকারি সূত্রগুলো বলছে, রোহিঙ্গাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে মিয়ানমারে ফেরত না পাঠানোর বিষয়ে সরকারের নীতিগত অবস্থান রয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রস্তুতি সত্ত্বেও রোহিঙ্গারা রাজি না হওয়ায় প্রত্যাবাসন শুরু করার দুই দফা উদ্যোগ ভেস্তে গেছে। সরকার যে রোহিঙ্গাদের জোর করছে না, তা-ও এতে স্পষ্ট। ভাসানচরের বিষয়েও সরকারের অবস্থান হলো রোহিঙ্গাদের মঙ্গলের কথা চিন্তা করেই তাদের একাংশকে স্থানান্তরের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে। রোহিঙ্গাদের সম্মতির ভিত্তিতে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা নিয়েই বাংলাদেশ ওই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে চায়।-ডেস্ক