(দিনাজপুর২৪.কম) আইডি নাম্বার ১৯১১৮৬৩৬৬৭৭২৮! কুমিল্লা থেকে নাজমুল আলম আগারগাঁওয়ের এনআইডির কার্যালয়ে এসেছেন। এদিক-সেদিক ছুটে ক্লান্ত হয়ে টাকা দিয়েও দালাল খুঁজে পাচ্ছেন না। একটি টেক্সটাইলে কাজ করেন তিনি। গত তিন মাস আগে একটি পরিচয়পত্রের জন্য তার চাকরি চলে গেছে! রাশিদা খাতুন রায়পুর থেকে এসে এ কক্ষ থেকে ও কক্ষে ঘুরছেন কিন্তু কোথায় কী সেবা তিনি জানতে পারছেন না। কার্যালয়ে কর্মরত আনসার, আরিফ, সুজন, আনোয়ার, জব্বার, মিজান ও আবদুল জলিলের সঙ্গে কথা বলেও কোনো সমাধান পাননি তিনি। ঘণ্টাখানেক দৌড়াদৌড়ি করে একপর্যায়ে আনসার জলিলের ওপর ক্ষেপেও যান রাশিদা। শিক্ষিত হওয়ায় তিন ঘণ্টার মধ্যে টোকেন পেয়ে যান গাজীপুর থেকে আসা ডুয়েটের শিক্ষার্থী মো. ইনজামুল ইসলাম। ২০১৪ সালে ভোটার হয়ে এখনো পরিচয়পত্র পাননি টাঙ্গাইলের মির্জাপুর থেকে আসা মুহাম্মদ সুজন মল্লিক। সকাল সাড়ে ১১টায় এসে বিকাল পৌনে চারটায় সংশোধনের সব কার্যক্রম শেষ করতে পেরেছেন তিনি। কিছুটা হাসিমুখে দেখা গেছে মহাখালী থেকে আসা বাবলু মিয়াকে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি সংশোধনের জন্য আবেদন করে ১৯ দিন পর স্বপ্নের কার্ড হাতে পেয়েছেন। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, কার্যালয়ের ভেতরে-বাইরে এখন দুর্নীতি নেই, তবে নড়েন না বড়সাহেবরা! গত রোববার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকাল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত ৫ ঘণ্টা ও সোমবার তিন ঘণ্টা আগারগাঁওয়ের এনআইডি কার্যালয়ে সরেজমিন অবস্থান করে এমন চিত্র দেখা গেছে।অতীতে দালাল চক্রের মাধ্যমে দুর্নীতির খবর পাওয়া গেলেও নির্বাচন কমিশনের শক্ত হস্তক্ষেপে এখন তা অনেকটাই পরিবর্তন হয়ে গেছে বলে মত সংশ্লিষ্টদের। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ভিআইপির নাম ব্যবহারকারী চিহ্নিত দালাল দুলালসহ বেশ কয়েকজনের ছবি প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন। এনআইডি কার্যালয়ের আশপাশে এমন কয়েকজনের ছবিসংবলিত ব্যনার-ফেস্টুন দিয়ে জনগণকে সচেতন করা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধনের জন্য তদবিরকারী দালালের চক্র হতে সাবধান! এসব দালালদের ধরিয়ে দিন। নির্বাচন কমিশনের এমন সচেতনতামূলক প্রচারণায় দুর্নীতি অনেকটাই পাল্টে গেছে। তবে ভোগান্তি চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। দায়িত্বরত ব্যক্তিরা কেউ আন্তরিকতার সঙ্গে সমস্যা নিয়ে আসা ব্যক্তিদের সঙ্গে ভালোভাবে কথা বলছেন না। অন্যদিকে কোথায় কোন সেবা পাওয়া যায় নেই এমন কোনো দিকনির্দেশনা। তাই এ কক্ষ থেকে ও কক্ষে দৌড়াচ্ছেন ভুক্তভোগীরা। বিশেষ করে যারা গ্রাম থেকে আসছেন তারা ভয়াবহ শ্রম ও অর্থের লোকসানে পড়ছেন। অনেককে ঢাকাতেই থাকতে হচ্ছে। একদিনে আবেদনের কার্যক্রমটাও শেষ করতে পারছেন না অনেকে।সরেজমিন দেখা গেছে, ভুল সংশোধনের চূড়ান্ত পর্যায়ে আসতে চারটি ধাপ অতিক্রম করতে হচ্ছে। প্রথমত তথ্য অনুসন্ধান। এখানেও দীর্ঘ লাইন। যদিও পুরুষ-নারী কক্ষ আলাদা করা হয়েছে। অনুসন্ধান কক্ষ থেকে দুই প্রক্রিয়ার কাজ করায় হ-য-ব-র-ল অবস্থাও দৃশ্যত! কেউ দাঁড়িয়েছেন তথ্য জানার জন্য, কেউবা সংশোধিত পরিচয়পত্র পাওয়ার জন্য। দ্বিতীয়ত, তথ্য অনুসন্ধান থেকে নিচতলায় ১০১ নম্বর রুমে যেতে হচ্ছে আইডি নাম্বার ও তথ্য যাচাইয়ের জন্য। এখানে স্লিপ পেলে দ্বিতীয় তলায় মূল সংশোধনের কাজের সুযোগ পাওয়া যায়। এ কক্ষ থেকেই জটিলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে অনেককে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে তথ্য যাচাইয়ের পর অনেককে দ্বিতীয় তলায় যেতে স্লিপ দেয়া হচ্ছে না। ফের থানা ও উপজেলায় পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে। বলা হচ্ছে, নিজ নিজ জেলায় গিয়ে সমাধান করতে। এছাড়া জেলায় কোন ধরনের সমাধান করা হয় এমন কিছু নির্দেশনা দিয়ে এনআইডি কার্যালয়ে লিফলেট লাগিয়েছে কমিশন। সেখানে বলা হয়েছে, জাতীয় পরিচয়পত্র হারানো, সংশোধন, স্থান পরিবর্তন, নতুন ভোটার নিবন্ধনে নিজ উপজেলা ও থানা নির্বাচন কমিশনে যোগাযোগ করার জন্য। তৃতীয় ধাপে ফরমের জন্য গিয়ে শুরু হয় ভোগান্তির চূড়ান্ত ধাপ! দিনের অধিক সময়ই থাকে সার্ভার নষ্ট। গত রোববার-সোমবারও ছিলো সার্ভার নষ্ট! কমিশনের বাইরে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বলেন, সার্ভার রক্ষণাবেক্ষণজনিত কারণে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের অপারেশন শাখার সকল কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। সাময়িক অসুবিধার জন্য আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত। অনেকে চতুর্থধাপে গিয়ে ব্যাংকে টাকা জমা দিয়েও তৃতীপ ধাপের প্রক্রিয়ায় আটকে থাকেন সার্ভার জটিলতায়। কমিশনের ভেতরে ব্যাংকে টাকা জমা দিতে যারা যাচ্ছেন তাদের কাছ থেকে একটি অভিযোগ পাওয়া গেছে। যারা ফরম পূরণ করতে পারেন না, ব্যাংকের ভেতরে কয়েকজন লোক আছে তারা ফরম পূরণ করে দিচ্ছেন। বিনিময়ে ১০০-র মতো টাকা নিচ্ছেন।আসা নাজমুল আলম তিনি বলেন, আমি কুমিল্লা থেকে ঢাকায় এসেছি পরিচয়পত্র ঠিক করার জন্য। রাতে ঢাকায় এসে এক আ্তীীয়ের বাসায় থেকেছি। এখানে এসে কোথায় কী কাজ হচ্ছে কিছুই বুঝতেছি না। দীর্ঘ দুই ঘণ্টা দাঁড়িয়ে আছি তথ্য-অনুসন্ধান কক্ষে। এখান থেকে আমাকে বলা হয় ফের জেলায় চলে যেতে, এর সমাধান ওখানেই করা হবে। আমার ছোট্ট সমস্যার জন্য ওখান থেকে এখানে আবার এখন এখান থেকে ওখানে যেতে বলছে। শুধু একটু তারিখ পরিবর্তন হবে। এখন জাতীয় পরিচয়পত্রে আমার জন্ম তারিখ দেয়া আছে ১৯-৪-১৯৮৯, যা হওয়ার কথা ছিলো ৩০-১২-১৯৯২। আলম আরও বলেন, আমি একটা টেক্সটাইলে কাজ করতাম। গত তিনমাস আগে পরিচয়পত্রের জন্য আমার চাকরি চলে গেছে। এলাকায় অনেক চেষ্টা করেও এর কোনো সমাধান পাইনি। সকাল থেকে চার ঘণ্টা ঘুরে টাকার বিনিময়েও দালাল খুঁজে পাননি বলেও জানান নাজমুল! ডুয়েটের শিক্ষার্থী মো. ইনজামুল ইসলাম। এসেছেন গাজীপুর থেকে। তিন ঘণ্টা অপেক্ষায় থেকে আঙ্গুলের ছাপ নিয়ে টোকেন পেয়েছেন। জানালেন, ২০১৬ সালে ভোটার হয়ে এখনো কার্ড পাননি। এ তরুণ জানালেন চাঞ্চল্যকর এক তথ্য! ইনজামুল ইসলাম বলেন, ভেতরে পুরো অব্যবস্থাপনায় কার্যক্রম চলছে। আইটি ও টাইপিংয়ে কর্মরত ব্যক্তিদের আমার খুবই অদক্ষ মনে হয়েছে। ৫ মিনিটের একটি কাজ ৩০-৪০ মিনিট লাগিয়ে দিচ্ছেন। তাদের কাজ চলছে কচ্ছপগতিতে। কোনো অভিজ্ঞ লোক ভেতরে আছে বলে আমার মনে হয়নি। অন্যদিকে কালশী থেকে আসা হাবিবুর রহমান দিলেন ভিন্ন অভিযোগ। ব্যাংক ড্রাফট করতে গিয়ে তাকে অতিরিক্ত ২০ টাকা বেশি দিতে হয়েছে। দু-একটা শব্দ লিখে দিয়েছে এজন্য। আমার সামনে এক মহিলার কাছ থেকে ১০০ টাকা নিয়েছে বলেও জানান হাবিবুর রহমান। নামে ভুলের জন্য টাঙ্গাইলের মির্জাপুর থেকে আসা মুহাম্মদ সুজন মল্লিক বলেন, ১৪ সালে ভোটার হই কিন্তু একটি ভুল এখনো ঠিক করতে পারিনি। এ জন্য এখানে এসেছি। আজকে সব শেষ করতে পারিনি। সার্ভারে সমস্যা রয়েছে। আগামীকাল আবার আসতে হবে। সকাল ১০টায় এসে বিকাল ৩টা ৪৫ মিনিটে এনআইডি কার্যালয় থেকে হাসিমুখে বের হন আলিয়া বেগম। তিনি এসেছেন উত্তরা থেকে। বললেন, সব প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে আগামী ১৩ তারিখ এসে জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে যেতে পারবো। দিনে কতজন লোক আবেদন করছেন, কোথায়, কোন কক্ষে কী সেবা দেয়া হচ্ছে এ বিষয়ে কোনো দিকনির্দেশনা না থাকায় অনেককে ভোগান্তির মুখোমুখি হতে হচ্ছে- এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের পরিচালক (অপারেশন) মো. আব্দুল বাতেন পরে কথা বলবেন বলে ফোন কেটে দেন। সার্ভার জটিলতার বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের সহকারী পরিচালক (বৈধ ও সঠিকতা যাচাইকরণ) মুহা. সরওয়ার হোসেন  বলেন, আগামী ১০ তারিখের মধ্যে সার্ভার ঠিক হয়ে যাবে। এরপর আর কোনো সমস্যা থাকবে বলে মনে করছি না। আমাদের ওপরের কর্মকর্তারা সব সময় খোঁজখবর রাখছেন বলেও জানান তিনি। জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম, এনডিসি, পিএসসি বলেন, হারানো, স্থানান্তরকৃত সমস্যাগুলো স্ব স্ব উপজেলা ও থানা নির্বাচন কমিশনেও ঠিক করার সুযোগ রয়েছে। তবুও সবাই এখানে ভিড় করছে। এ নিয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি-নির্দেশনা রয়েছে। আশা রাখছি এ জটিলতাগুলো আর থাকবে না। -ডেস্ক