(দিনাজপুর২৪.কম) পরিকল্পনা হয় দুই মাস আগে। তিন দলে ভাগ হয়ে চালানো হয় অপারেশন। মোট ১৩ জন অংশ নেয় কোটি টাকা লুটের এ মিশনে। লুটের পর প্রথমে তিন ভাগে ভাগ করে নিয়ে যায় টাকা। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পর নিজেদের মধ্যে টাকা ভাগাভাগি করার কথা ছিল। করেছেও তাই। কিন্তু একজনের ভাগের ৯ লাখ টাকা ছিল ডাকাত সরদার হাবীব ওরফে রুবেলের কাছে। সেই টাকা দেয়ার পাশাপাশি বৈঠকে মিলিত হওয়ার কথা ছিল তাদের। সে অনুযায়ী আত্মগোপন থেকে বেরিয়ে আসে তারা। পাশাপাশি টার্গেট ছিল নতুন মিশন চালানোর। কিন্তু তার আগেই অভিযান চালিয়ে মূল হোতা হাবীব ওরফে রুবেলসহ ১০ জনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ৯ লাখ টাকা, দুটি আগ্নেয়াস্ত্র ও দুটি ছোরা। গ্রেপ্তারকৃত অপর সদস্যরা হলো শাহাদাত (২৪), ইসমাইল (২৮), শহীদুল ইসলাম ওরফে শহীদ (৩৬), ফরিদ (৩৩), দেলোয়ার ওরফে দেলু (২৮), ইব্রাহীম (২৩), নজরুল ইসলাম ওরফে সবুজ (২৩), আলমগীর হোসেন
ওরফে পাঞ্জু মোল্লা (৪৯) ও হাসান মীর (৩৪)। গতকাল র‌্যাব সদর দপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়। গ্রেপ্তারকৃতরা জানায়, লুটের পর তারা টাকা নিয়ে ময়মনসিংহ রোডের মাওনা ফুলবাড়িয়ার দিকে চলে যায়। সেখানে গিয়ে ট্রাংক থেকে টাকা তিন ভাগে ভাগ করে তিন দল হয়ে আত্মগোপনে চলে যায়।
গত ২রা মার্চ রাতে গাজীপুর কালিয়াকৈরের কোনাবাড়ি এলাকার ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংকের এটিএম বুথে টাকা জমা রাখার সময় এক কোটি ৮৪ লাখ টাকা লুট করে নিয়ে যায় ডাকাত দল। ঘটনার পর পরই কালিয়াকৈর থানা পুলিশ মিন্টু ও ইমন নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করে। তবে তাদের কাছ থেকে টাকা উদ্ধার করতে পারেনি। এ ঘটনায় আমিনুল নামে একজন এখনও পলাতক। র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান বলেন, এটিএম বুথের প্রায় দুই কোটি টাকা লুটের ঘটনার পর থেকেই র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখা ও র‌্যাব-১-এর একটি অভিযানিক দল গোয়েন্দা তৎপরতা ও অভিযান শুরু করে। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে র‌্যাবের অভিযানিক দলটি জানতে পারে এটিএম বুথ লুটের মূল হোতা রুবেল টাকা ভাগের একটি অংশ আরেক সহযোগী ডাকাত শহীদকে দিতে যাচ্ছে। একই সঙ্গে তারা নতুন অপারেশনে নামার জন্য বৈঠক করবে। এ তথ্যের ভিত্তিতে র‌্যাব সদস্যরা গাজীপুরের জয়দেবপুর ইটাহাটি জমির উদ্দিন মার্কেটের সামনে ছদ্মবেশে অবস্থান নেন। রাত ১১টার দিকে ভাড়া করা একটি টেম্পো থেকে ডাকাত সরদার রুবেল, শাহাদাত ও ইসমাইলকে আটক করা হয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে দুটি পিস্তল, ৯ লাখ ৪ হাজার ৮৪৫ টাকা উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা এটিএম বুথের টাকা লুটের ঘটনা স্বীকার করে। পরে তাদের দেয়া তথ্য মতে গাজীপুরের শালনা বাজার থেকে ডাকাত শহীদকে গ্রেপ্তার করা হয়। ডাকাত শহীদের দেখানো মতো দুটি বড় ছোড়া উদ্ধার করা হয়। একই সঙ্গে জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানায়, তাদের অপর একটি গ্রুপ উত্তরার জসীমউদ্‌দীন এলাকায় অবস্থান করছে। পরে তাদের দেয়া তথ্য মতে গতকাল ভোর সাড়ে ৪টার দিকে জসীমউদ্‌্‌দীন এলাকা থেকে ফরিদ, দেলু, ইব্রাহিম, সবুজ পাঞ্জু মোল্লা ও হাসানকে আটক করা হয়।
র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে ডাকাত সরদার হাবিব ওরফে রুবেল জানায়, সে ও মিন্টু মিলে এ ডাকাতির পরিকল্পনা করেছিল। ঘটনার দুই মাস আগে থেকে তারা গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকার এটিএম বুথে টাকা জমার বিষয়গুলো রেকি করতে থাকে। তারা জানতে পারে মাসের প্রথমদিকে এটিএম বুথে টাকা ঢোকানোর চাপ থাকায় গভীর রাত পর্যন্ত ব্যাংকের গাড়ি টাকা নিয়ে বুথে বুথে যায়। এ তথ্য সংগ্রহ করে তারা কোনাবাড়ির একটি বুথকে টার্গেট করে। ঘটনার তিন দিন আগে থেকে ইমন, মিন্টু ও শাহাদাত বুথের সামনে দিন-রাত অবস্থান নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করে। ঘটনার দিনও তারা সকাল থেকে সেখানে অবস্থান নেয়। রাত ৯টায় একটি পিকআপযোগে (ঢাকা মেট্রো গ-১৪-৭১১৮) বুথের পাশেই অবস্থান করতে থাকে রুবেল, ফরিদ, আমিনুল, ইসমাইল, শহীদ, দেলোয়ার ও ইব্রাহিম। পাঞ্জু, হাসান ও নজুরুল আশপাশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য আলাদা অবস্থান করে। রাত ২টায় ডাচ্‌্‌-বাংলার নিয়োগকৃত মানি প্লান্ট সিকিউরিটির গাড়িটি বুথে টাকা ঢোকাতে আসার সঙ্গে সঙ্গেই হামলা চালায় তারা। অস্ত্রের মুখে সবাইকে জিম্মি করে টাকাভর্তি দুটি ট্রাংক নিয়ে নির্বিঘ্নে চলে যায়। পুরো অভিযান চলে ফিল্মি কায়দায়। মধ্যরাত হওয়ায় আশপাশে কোনো লোকজনও ছিল না। মানি প্লান্টের গাড়ির সঙ্গে দুজন অস্ত্রধারী নিরাপত্তারক্ষী থাকলেও তারা কোনো বাধা সৃষ্টি করতে পারেননি।
রুবেল জানায়, মিন্টু তাদের আগেই জানিয়েছিল সিকিউরিটির লোকজন কোনো বাধা সৃষ্টি করবে না। তবে অপারেশন চালানোর সময় সিকিউরিটির লোকজনের সঙ্গে তাদের সামান্য হাতাহাতি হয়। তিন থেকে চার মিনিটের মধ্যে তারা ডাকাতি কার্যক্রম শেষ করে সেখান থেকে চলে যায়। রুবেলের ভাষ্য, তারা সবাই পিকআপ নিয়ে প্রথমে জেলখানা রোডের দিকে যেতে থাকে। কিছুক্ষণ এদিক-সেদিক ঘোরাফেরা করার পর তারা মাওনা ফুলবাড়িয়ার দিকে যায়। ফুলবাড়িয়া পৌঁছানোর আগেই রাস্তার পাশে পিকআপ থামিয়ে ট্রাংক ভেঙে টাকা বের করে। পুরো টাকা গুনে দেখে ১ কোটি ৮৪ লাখ রয়েছে। তিন ভাগে ভাগ করা হয় এ টাকা। তিনটি বস্তায় ঢোকানো হয় সেসব। দুটি বস্তায় ৬০ লাখ টাকা করে আর আরেক বস্তায় ৬৪ লাখ টাকা নেয়া হয়। এরপর তারা চলে যায় মাস্টারবাড়ির দিকে। সেখানে পৌঁছানোর পর আগের পরিকল্পনামতো ৬০ লাখ টাকাসহ একটি ব্যাগ ইসমাইলকে দেয়। ৬০ লাখ টাকাসহ আরেকটি ব্যাগ দেয় শাহাদতকে। বাকি ৬৪ লাখ টাকার ব্যাগটি রুবেল নিজের কাছে রাখে। আলোচনা করে টাকা ভাগাভাগি হবে পরে। আগে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হোক। আপাতত টাকাগুলো লুকিয়ে রেখে কিছুদিন আত্মগোপনে থাকার সিদ্ধান্ত নেয় তারা। ঘটনার পর পরই তাদের দলের মিন্টু ও ইমন ধরা পড়ে যায় পুলিশের কাছে। এতে কিছুটা ভয় পেয়ে গিয়েছিল তারা। কিন্তু পুলিশ তাদের খোঁজ পায়নি। এতে কিছুটা স্বস্তি পেয়ে কিছুদিন আগে তারা পুরো টাকা ভাগাভাগি করে নেয়। নতুন পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নামে আবার। এর মধ্যেই র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হয় তারা। একই কথা জানায় ডাকাত শহীদও। র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আবুল কালাম আজাদ বলেন, টাকাগুলো ভাগবাটোয়ারা করে নিয়ে কিছু খরচ ও কিছু আত্মীয়স্বজনের কাছে রেখেছে। আসামিদের পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হবে। তারা রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে বাকি টাকা উদ্ধার করতে পারে।
এদিকে ডাচ্‌্‌-ব্যাংলা ব্যাংক ও মানি প্লান্ট-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, মাসের প্রথমদিকে গার্মেন্টকর্মীদের বেতন দেয়া হয়। গার্মেন্টকর্মীরা ইলেকট্রনিক ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বুথ থেকে টাকা তুলে। এজন্য মাসের প্রথমদিকে প্রচণ্ড চাপ থাকে। বুথে টাকা না থাকলে গার্মেন্টকর্মীরা বুথ ভাঙচুর করে। এজন্য মধ্যরাত হলেও বুথে টাকা ঢোকাতে হয় তাদের। মানি প্লান্টের একজন কর্মকর্তা জানান, তাদের সিকিউরিটিদের পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। তাদের দায়িত্বে অবহেলার কারণে ছাঁটাই করে দেয়া হয়েছে। ওই কর্মকর্তা বলেন, সিকিউরিটি কোম্পানি চালানো মুশকিল হয়ে পড়েছে। অস্ত্রের লাইসেন্সসহ কর্মী পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকার সাধারণ পর্যায়ে অস্ত্রের লাইসেন্স দেয়া বন্ধ রেখেছে। এ কারণে উচ্চ বেতনেও লাইসেন্সধারী নিরাপত্তারক্ষী পাওয়া যায় না।
র‌্যাব কর্মকর্তার জানান, বেসরকারি সিকিউরিটি কোম্পানিগুলো যাচ্ছেতাইভাবে চলছে। কোনো প্রশিক্ষণ নেই তাদের। এ কারণে লুট বা ডাকাতি হচ্ছে হরহামেশাই। চাপ বাড়ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর। সূত্র : ম. জমিন