(দিনাজপুর২৪.কম) অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানকে গুলি করার ঘটনা ‘এক থেকে দুই মিনিটের’ মধ্যে ঘটেছিল বলে জানিয়েছে র‌্যাব। এই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে এমন কী ঘটেছিল, যার কারণে সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানকে গুলি করতে হলো? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই গতকাল শুক্রবার ওসি প্রদীপ কুমার দাসসহ ঘটনার মূল অভিযুক্ত ৩ আসামিকে নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন র‌্যাবের তদন্ত দল। দুপুর ১টার দিকে টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর পুলিশ তদন্তকেন্দ্র পরিদর্শন করেন। এ সময় সিনহাকে গুলির ঘটনাস্থল তল্লাশি চৌকিতেও নেওয়া হয় রিমান্ডে থাকা ৩ পুলিশ কর্মকর্তাকে। সেখানে কীভাবে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছিল তদন্ত কর্মকর্তার কাছে তারা নিজেদের মতো করে বর্ণনা দেন। পরে বেলা ৩টার দিকে তাদের নিয়ে ফিরে যায় তদন্ত দল।

গত ৩১ জুলাই রাত ১০টার দিকে টেকনাফের বাহারছড়া শামলাপুর তল্লাশি চৌকিতে পুলিশের গুলিতে নিহত হন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা। এ ঘটনায় অভিযুক্ত ও রিমান্ডে থাকা ওসি প্রদীপ কুমার দাস, পরিদর্শক লিয়াকত আলী ও এসআই নন্দ দুলাল রক্ষিতকে পৃথকভাবে ঘটনাস্থলে নিয়ে ঘটনার বিবরণ শোনেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। দুপুর ১টার দিকে র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) কর্নেল তোফায়েল মোস্তফা সরওয়ারের নেতৃত্বে একটি টিম অভিযুক্ত আসামিদের নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। এ সময় তদন্ত কর্মকর্তা ঘটনাস্থলের কাছে দাঁড়িয়ে অভিযুক্তদের কাছে ঘটনার আদ্যোপান্ত জানতে চান। এর পরিপ্রেক্ষিতে অভিযুক্তরা নিজেদের মতো করে ঘটনার বিবরণ তুলে ধরেন। এ সময় অতিরিক্ত মহাপরিচালক

কর্নেল তোফায়েল মোস্তফা সরওয়ার ছাড়াও র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার প্রধান লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ এবং সিনহা হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিনিয়র পুলিশ সুপার মোহাম্মদ খায়রুল ইসলামসহ র‌্যাবের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

ঘটনার সময় সিনহার গাড়ি কোন পজিশনে রাখা ছিল, কীভাবে গাড়ি থেকে নেমে এলেন, লিয়াকত সুনির্দিষ্ট কোন পজিশনে দাঁড়িয়েছিলেন, তাদের মধ্যে কী কথাবার্তা হয়েছিল- এ রকম নানা প্রশ্নের জবাব খোঁজেন তদন্ত কর্মকর্তা। কখন ওসি প্রদীপ ঘটনাস্থলে আসেন, আসার পর লিয়াকতের সঙ্গে প্রদীপের কী কথা হয়েছিল, প্রদীপ কুমার গুলিবিদ্ধ সিনহার সঙ্গে কী ধরনের আচরণ করেছিলেন তা তাদের মুখ থেকে জানার চেষ্টা করেন র‌্যাবের তদন্ত কর্মকর্তা।

সেখানে র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল তোফায়েল মোস্তফা সরওয়ার সাংবাদিকদের বলেন, আমরা সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজছি, কেন এই ফায়ারিংটা সংঘটিত হয়েছিল? এই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে কী এমন ঘটেছিল, সিনহা গুলিবিদ্ধ হয়েছিল? কিংবা লিয়াকত যেটা বলছে, পিস্তল তাক করে ফেলেছিল- এক দুই মিনিটের মধ্যে কী এমন হয়েছিল, পিস্তল তাক করার মতো পরিস্থিতি এলেই হয়েছিল কিনা, আর সেই বা কেন ফায়ার করল? আমাদের অনেক তথ্য উপাত্ত সংগ্রহীত হয়েছে। সেটার আলোকেই আইও নিজেকে সন্তুষ্ট করার জন্য, যেন কোনোভাবেই কোনো নির্দোষ ব্যক্তি সাজা না পায় এবং কোনো দোষী ব্যক্তি যেন কোনোভাবেই ছাড় না পায়।

র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল তোফায়েল মোস্তফা সরওয়ার বলেন, ‘মেজর সিনহাকে গুলিবর্ষণের পুরো ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছে এক থেকে দুই মিনিটের মধ্যে। এই দুই মিনিটের প্রতিটি সেকেন্ডের ঘটনাপ্রবাহ আমরা বিচার-বিশ্লেষণ করছি। প্রতিটি সেকেন্ডই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ঘটনার অনেক তথ্য-উপাত্ত আমরা সংগ্রহ করেছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘রিমান্ডে থাকা আসামি, সাক্ষী ও বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে তদন্ত অনেক এগিয়েছে। এটি তদন্তের স¦ার্থে এখনই বলা যাবে না। এতে মামলার কাজে ব্যাঘাত সৃষ্টি হতে পারে।

এদিকে আদালতের নির্দেশের পর কক্সবাজারের রামুর হিমছড়ি এলাকার নীলিমা রিসোর্ট থেকে অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান ও তার সহকর্মী শিপ্রা দেবনাথের ব্যবহৃত ল্যাপটপসহ ২৯টি ডিভাইস ও টাকা হেফাজতে নিয়েছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)।

গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১২টায় রামু থানাপুলিশের কাছ থেকে ডিভাইসগুলো নিজেদের হেফাজতে নেয় র‌্যাব। র‌্যাবের তদন্ত কর্মকর্তা সহকারী পুলিশ সুপার বিমানচন্দ্র কর্মকারের নেতৃত্বে র‌্যাবের একটি দল রাত ১২টার দিকে রামু থানায় গিয়ে এসব মাল গ্রহণ করেন। তিনি এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন। এ সময় রামু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল খায়ের উপস্থিত ছিলেন বলে জানান বিমানচন্দ্র কর্মকার।

মেজর (অব) সিনহার সহযোগী শিপ্রা দেবনাথকে গ্রেপ্তারের পর ল্যাপটপ, হার্ডডিস্ক, পেনড্রাইভ, টাকাসহ বিভিন্ন ডিভাইস নিয়ে যায় রামু থানাপুলিশ। র‌্যাবের তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে রামু থানার হেফাজতে থাকা ল্যাপটপ হার্ডডিস্কসহ ২৯টি ডিভাইস ও টাকা র‌্যাবের কাছে হস্তান্তরের জন্য ১৯ আগস্ট আদেশ দেন আদালত। কিন্তু এসব মাল পুলিশের হেফাজতে রাখতে আদালতে আবেদন করে রামু থানাপুলিশ। ২০ আগস্ট কক্সবাজার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক হেলাল উদ্দিন পুলিশের আবেদনটি খারিজ করে দেন। রামু থানায় থাকা নীলিমা রিসোর্ট থেকে পুলিশের জব্দ করা ডিভাইসসহ সব জিনিসপত্র র‌্যাবের হেফাজতে দেওয়ার আদেশ বহাল রাখেন আদালত।

গত ৩১ জুলাই রাতে টেকনাফের মারিশবুনিয়া পাহাড়ে ভিডিওচিত্র ধারণ করে মেরিন ড্রাইভ দিয়ে কক্সবাজারের হিমছড়ি এলাকার নীলিমা রিসোর্টে ফেরার পথে শামলাপুর তল্লশি চৌকিতে পুলিশের গুলিতে নিহত হন অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান। এ সময় পুলিশ সিনহার দুই সহযোগী সিফাত ও শিপ্রা দেবনাথকে গ্রেপ্তার করে। -ডেস্ক