(দিনাজপুর২৪.কম) একের পর এক ব্লগারকে হত্যা করা হচ্ছে। নির্দিষ্ট বিরতির কয়েক দিনের মাথায় দুর্বৃত্তরা টার্গেট করে ব্লগারদের গলা কেটে কুপিয়ে হত্যা করছে। ছয় মাসে এ পর্যন্ত চার ব্লগারকে হত্যা করা হয়েছে। সব কয়টি হত্যাকাণ্ডের ধরন একই রকম। তবে এ হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে কারা তা আজো বের করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ দিকে অভিযোগ এসেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ব্লগারদের তালিকা থাকলেও ব্লগারদের নিরাপত্তায় কোনো ব্যবস্থা নেয়নি সরকার।

জানা গেছে, ব্লগারদের অনেকেই দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। যারা দেশে আছেন তারাও রয়েছেন আতঙ্কে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে এখন একটাই প্রশ্ন এরপর কে? আর এসব ব্লগার হত্যার ঘটনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কোনো ক্লু খুঁজে না পাওয়ায় স্বভাবতই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে ব্লগার হত্যার নেপথ্যে কারা? কেনই বা তাদের ধরছে না পুলিশ? তবে খুনের বিচার না হওয়ায় দিনদিন ব্লগার হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা বাড়ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

নিলয় হত্যার আগের তিন ব্লগারকে শত শত মানুষের সামনে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তবে শুক্র্রবারের হত্যাকাণ্ডের ঘটনা আরো লোমহর্ষক। বাসায় ঢুকে স্ত্রীর সামনে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে ব্লগার নিলয় চক্রবর্তী নিলয়কে। প্রকাশ্যে একের পর এক ব্লগার খুন হলেও অসহায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। আসামিদের গ্রেফতার করতে পারছে না। ক্লু খুঁজে পাচ্ছে না, কূলকিনারা হচ্ছে না এসব হত্যাকাণ্ডের।

ব্লগার হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে পুলিশ জানায়, ব্লগার হত্যাকারীদের ব্যাপারে তাদের কাছে তেমন কোনো তথ্য নেই। তাদের ধারণা মতাদর্শের কারণে এসব খুন হচ্ছে। ‘কাট আউট’ পদ্ধতিতে খুনিরা হত্যাকাণ্ডে অংশ নিচ্ছে। এ পদ্ধতিতে খুনিদের অপরের সাথে দু-এক দিনের পরিচিত হয়ে থাকে। প্রযুক্তি কিংবা ঊর্ধ্বতন নেতাদের মাধ্যমে যোগাযোগের পর তারা খুন করে আবার পৃথক হয়ে যায়। ফলে এক খুনি আরেক খুনি সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য জানে না। তাই হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়ায় খুনিদের চিহ্নিত করতে সময় লাগছে।

তবে ব্লগার হত্যাকারীদের গ্রেফতার ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে বাংলাদেশে বারবার ব্লগার হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে বলে মন্তব্য করেছেন গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার।

তিনি বলেন, যদি ব্লগার রাজীব হায়দার হত্যার সুষ্ঠু বিচার হতো তাহলে আজ নিলয়কে হত্যার শিকার হতে হতো না। বারবার ব্লগারদের প্রকাশ্যে নির্মমভাবে হত্যা করা হলেও এ ব্যাপারে সরকার উল্টো ভূমিকা পালন করছে। ব্লগার হত্যায় অপরাধীদের শাস্তি না দিয়ে উল্টো ভিকটিমদের বিদেশ চলে যাওয়ার জন্য প্ররোচিত করা হচ্ছে।

ইমরান এইচ আরো বলেন, যদি রাজীব হত্যার বিচার হতো তাহলে আজ এমন হতো না। আজ প্রধানমন্ত্রী বা কোনো মন্ত্রীকে কটূক্তি করার সাথে সাথে অপরাধীকে আটক করা হচ্ছে। কিন্তু আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলি তাদের হত্যা করলে কোনো বিচার হয় না। এমনকি কোনো পদক্ষেপও নেয়া হচ্ছে না।

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (অর্গানাইজড ক্রাইম) মির্জা আব্দুল্লাহ হেল বাকী সাংবাদিকদের বলেন, ব্লগার হত্যাকাণ্ডের তদন্ত বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে করা হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডের আসামিদের শনাক্ত করতে পুলিশ স্থানীয় সোর্সদের পাশপাশি প্রযুক্তির ব্যবহার করছে। তদন্তে কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে। তবে আসামিদের চিহ্নিত করে গ্রেফতারে কিছুটা সময় লাগছে। সিলেটে ব্লগার অনন্ত বিজয় দাস হত্যার ব্যাপারে তিনি বলেন, এ ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে স্থানীয় ফটোসাংবাদিক ইদ্রিস আলীকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তবে কয়েক দফা তাকে রিমান্ডে এনেও হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে এ ঘটনার তদন্তে কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্মকমিশনার মনিরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, অপরাধীরা যত কৌশলই অবলম্বন করুক না কেন তারা পুলিশের চোখ ফাঁকি দিতে পারবে না। ব্লগার হত্যায় জড়িতদের গ্রেফতারে পুলিশ আন্তরিক। খুব দ্রুতই খুনিরা গ্রেফতার হবে।

গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় লেখক ও ব্লগার অভিজিৎ রায়কে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। হামলাকারীর চাপাতির আঘাতে আঙুল হারান তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যা। গোয়েন্দা পুলিশকে তদন্তে সহায়তা করতে এফবিআইয়ের প্রতিনিধিদলও হত্যার কিছু আলামত পরীক্ষার জন্য নিয়ে গিয়েছিল। তবে তদন্ত সেখানে স্থবির হয়ে আছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপপরিদর্শক ফজলুর রহমান বলেন, পুলিশ ধারণা করছে আনসারউল্লাহ বাংলাটিমের সদস্যরাই অভিজিৎ রায়কে হত্যা করেছে। হত্যাকারীরা ‘কাট আউট’ পদ্ধতিতে খুন করায় তাদের শনাক্ত করে গ্রেফতার করতে কিছুটা সময় লাগছে। অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ডের এক মাসের মাথায় খুন হন ওয়াশিকুর রহমান বাবু নামে আরেক ‘অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট’।

তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলের বেগুনবাড়িতে হত্যাকাণ্ডের পরপরই জনতা ধাওয়া করে জিকরুল্লাহ ও আরিফুল নামে দুই মাদ্রাসা ছাত্রকে ধরে ফেলে। গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার সাইফুল ইসলাম জানান, ব্লগার বাবু হত্যায়ও আনসারউল্লাহ বাংলাটিমের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে পুলিশ অনেকটাই নিশ্চিত। বাবু হত্যায় সরাসরি অংশ নেয়া দু’জনকে জনতা আটক করে পুলিশে দিয়েছিল। হত্যার পরিকল্পনায় অংশ নেয়া আবু তাহেরকেও যাত্রাবাড়ী থেকে একটি অস্ত্রসহ গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। এখন হত্যার অন্যতম পরিকল্পনাকারী মাসুমকে খুঁজছে পুলিশ। গত ১২ মে সিলেটের সুবিদবাজার এলাকার বাসা থেকে কর্মস্থলে যাওয়ার পথে মুক্তমনার ব্লগার ও সিলেট গণজাগরণ মঞ্চের সংগঠক অনন্তকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

এর আগে ২০১৩ সালে শাহবাগ আন্দোলন শুরুর দশম দিনে ১৫ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর মিরপুরে নিজের বাসার সামনে কুপিয়ে হত্যা করা হয় ব্লগার আহমেদ হায়দার রাজীবকে। ধর্মীয় উগ্রবাদীরা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে পুলিশের তদন্তে উঠে আসে। ২০১৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পেছনে আমবাগান গ্রামের ফ্ল্যাটে কুপিয়ে এবং গলা কেটে হত্যা করা হয় ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ব্লগার আশরাফুল ইসলামকে। ২০১৩ সালের ৯ এপ্রিল প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কবি নজরুল ইসলাম হলে কুপিয়ে হত্যা করা হয় ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ব্লগার আরিফ রায়হান দ্বীপকে। একই বছরের ১৪ ফেব্রুয়ারি অগ্রণী ব্যাংকের কর্মী ও ব্লগার জাফর মুন্সিকে প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে এবং পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ব্লগার মামুন হোসেন, ২ মার্চ ব্লগার জগৎজ্যোতি তালুকদার ও ব্লগার জিয়াউদ্দিন জাকারিয়া বাবুকে হত্যা করা হয়।(ডেস্ক)