(দিনাজপুর ২৪.কম) কার্তিক যখন খুব ছোট, বাবা তাঁকে গল্প শোনাতেন। বলতেন, ‘কী হবে গিয়ে তীর্থে? শুধু তীর্থে গেলেই তো পুণ্য হয় না। ক্লান্ত পথিকের জন্য যদি গাছ বোনো, তবে তীর্থে যাওয়ার চেয়েও পুণ্য হবে বেশি।’ ছোট্ট কার্তিকের মনে গেঁথে যায় সে কথা। কথাটি মনে রেখে ১০ বছর বয়সে কার্তিক বৃক্ষ রোপণ করতে শুরু করেন। জীবনের প্রথম গাছটি তিনি লাগান এলাকার একটি তেরাস্তার মোড়ে। সেই কার্তিক পরামানিকের বয়স এখন ৭৫ বছর। এখনো অক্লান্তভাবে গাছ লাগিয়ে চলেছেন তিনি।
কার্তিকের দেখা পেতে হলে যেতে হবে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা সদর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে, শিবগঞ্জ উপজেলায়। সেখানে ভারতীয় সীমান্তের কোল ঘেঁষে তারাপুর ঠুটাপাড়া গ্রাম। এখানেই কার্তিকের বাড়ি। ভারত ভাগ হওয়ার আগে তাঁরা থাকতেন একই উপজেলার রাধাকান্তপুর গ্রামে। একসময় আত্মীয়স্বজনেরা সবাই ভারত পাড়ি দিলেন। রয়ে গেলেন কেবল কার্তিকের বাবা। তিনি শুধু গ্রামটি বদল করলেন।
এলাকার বৃক্ষহীন ধু ধু বালুচরে হাঁটতে গেলে আগে বালুর তাপে পায়ে ফোসকা পড়ে যেত। মাথার গামছা পায়ে বেঁধে হাঁটত লোকে। ছোট্ট কার্তিক সেখানে চারা লাগাতে শুরু করলেন একটি-দুটি করে। তাঁর লাগানো চারাগাছে ভরে যেতে লাগল বিরাণ সেই প্রান্তর। তরুণ বয়সে গাছ লাগানোর ঝোঁকটা আরও বাড়ল। পেশা তাঁর ক্ষৌরকারের। সামান্য যে কয় টাকা আয় হতো, তা থেকে কিছুটা জমিয়ে রাখতেন। সে টাকায় চারা কিনে পথেঘাটে, মানুষের বাড়ির সামনে, স্কুলের মাঠে লাগাতেন। বাঁশের বেড়া দিতেন। দিনে-রাতে যখনই সময় পেতেন, পানি ঢেলে পরিচর্যা করতেন গাছের। লোকে তাঁকে বলত ‘পাগল’। ব্যঙ্গ করে কেউ কেউ বলত, ‘গরিবের ঘোড়ারোগ হয়েছে।’ কিন্তু কারও কথায় কান না দিয়ে কার্তিক আশপাশের গ্রামগুলো ভরে ফেললেন গাছে। বালুচর ছেয়ে গেল সবুজে। এলাকায় এ পর্যন্ত গাছ লাগিয়েছেন কমবেশি ২০ হাজার।
সেই ছেলেবেলায় লাগানো চারাগুলো এখন বিরাট সব ছায়াবৃক্ষ। বহু যত্নে, বহু শ্রমে, বহু ঘামে, বহু পরিচর্যায় একেকটি গাছ বেড়ে উঠেছে। রাস্তার ধারে, মোড়ে, বাজারে, হাটখোলায়, স্কুল-কলেজে, মাদ্রাসায়, মাঠে, ঈদগাহে, সীমান্ত-ফাঁড়িতে বট-পাকুড়-জাম-শিমুল-নিমের মস্ত যত গাছ, তার প্রায় সব কটিতেই লেগে আছে কার্তিক পরামানিকের স্পর্শ।
কার্তিকের লাগানো গাছগুলো গ্রামে বয়ে এনেছে আশীর্বাদ। স্কুলে বা মাদ্রাসায় লাগানো কিছু বড় গাছ বিক্রির টাকায় গড়ে উঠেছে ঈদগাহের সীমানাপ্রাচীর। কারও বাড়ির সামনে লাগানো গাছ বেচে মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন অভাবী কোনো বাবা-মা। কার্তিকের লাগানো গাছের ছায়ায় বসেছে বাজার। বৃক্ষরোপণের এই কর্মযজ্ঞ থেকে কার্তিক কিন্তু একটিও টাকা নেননি। গাছ লাগিয়ে যাওয়াই যেন তাঁর জীবনের একমাত্র ব্রত।
১৯৮৪ সালে প্রত্যন্ত এই চরে স্বাস্থ্যকর্মীর চাকরি নিয়ে এসেছিলেন তরিকুল ইসলাম। পেশার কারণে অনেকটা পথ হাঁটতে হতো তাঁকে। হাঁটতে হাঁটতে বিশ্রাম নিতেন কোনো না-কোনো গাছের ছায়ায়। একসময় জানতে পারলেন, এলাকার ১০-১২ কিলোমিটারজুড়ে যে বৃক্ষের সমাহার, তার পুরো কৃতিত্ব কার্তিক পরামানিকের। অভিভূত হয়ে গেলেন তরিকুল। এলাকার লোকজনকে নিয়ে কার্তিককে তিনি দিলেন সংবর্ধনা। তরিকুল ইসলাম এখন স্থানীয় একটি কলেজের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক।
২০০৩ সালের ২ ডিসেম্বর প্রথম আলোর প্রথম পাতায় ‘বিশাল বিশাল বৃক্ষগুলো যেন একেকটি কার্তিকনামা’ শিরোনামে প্রতিবেদন বেরোয়। সে প্রতিবেদন চোখে পড়ে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়রের। কার্তিক পরামানিককে তিনি সংবর্ধনা দেন। তাঁকে পুরস্কৃত করেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিডিআরের ব্যাটালিয়ন কমান্ডার। ২০০৭ সালে চ্যানেল আই কার্তিককে দেয় কৃষি পদক। পদক প্রদান অনুষ্ঠানে সে সময়কার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) আনোয়ারুল ইকবাল কার্তিকের কাছে জানতে চাইলেন তাঁর আকাঙ্ক্ষার কথা। কার্তিক বললেন, ‘আমার ব্যক্তিগত কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই। শিবগঞ্জের মনাকষা ইউনিয়নের রানীনগর মোড় থেকে আমার গ্রাম পর্যন্ত কাঁচা রাস্তাটি পাকা করে দিতে হবে। যাতায়াত করতে মানুষজনের খুব কষ্ট হয়। জনপ্রতিনিধিরা বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট নেন, কিন্তু রাস্তা করে দেন না। আমি শুধু রাস্তাটা চাই।’ ২০০৯ সালের মধ্যেই কার্তিকের বাড়ি পর্যন্ত প্রায় ৭ কিলোমিটার রাস্তা পাকা করে দেয় স্থানীয় সরকারের প্রকৌশল অধিদপ্তর।
২০১৩ সালে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের অষ্টম শ্রেণির ইংরেজি পাঠ্যবইয়ে ‘আ ম্যান হু লাভস ট্রি’ শিরোনামে তাঁর কীর্তি অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
২০১৪ সালে প্রায় চার কোটি টাকায় এই রাস্তার প্রান্তে মরা পদ্মা নদীর ওপর সেতুও করা হয়। রাস্তাটি পাকা হওয়ার পর এলাকার মানুষের আগের সেই সীমাহীন দুর্ভোগ এখন আর নেই। কৃষিপণ্য পরিবহন করা যাচ্ছে সহজে। এলাকার কৃষক তাঁদের উত্পাদিত কৃষিপণ্য আগের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করতে পারছেন।
সাহাপুর রাঘববাটী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিশাল বকুলগাছটি দেখিয়ে স্কুলের প্রধান শিক্ষক জিয়াউল হক বলেন, ‘এই বকুলগাছের চারাটির জন্য কার্তিককে আমি ১ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত দিতে চেয়েছিলাম। তিনি তা নেননি। বিদ্যালয়-প্রাঙ্গণে নিজেই চারাটি রোপণ করেছেন। পরিচর্যাও করেছেন।’
সাহাপাড়ার রাস্তায় ৪০ বছর আগে একটি বটগাছ লাগিয়েছিলেন কার্তিক পরামানিক। গাছটি এখন মহিরুহ। জায়গাটির নামও এখন সাহাপাড়া বটতলা। বটতলাকে ঘিরে একটি-দুটি দোকান বসতে বসতে সেটি এখন এক বাজার। বাজারের ষাটোর্ধ্ব সেরাজুল ইসলাম বলেন, ‘কার্তিক পরামানিকের লাগানো গাছের কারণে এখানে বাজার হয়েছে। রাস্তা পাকা হয়েছে। আমরা তাঁর প্রতি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ।’
এলাকায় কার্তিক পরামানিকের প্রতি কৃতজ্ঞ সবাই। কিন্তু সেসব নিয়ে কার্তিক মোটেই ভাবিত নন। তাঁর উত্তেজনা গাছের নতুন নতুন চারা নিয়ে। চারা নিয়ে তিনি ছুটতে থাকেন পথে। লাগাতে থাকেন গাছ। তাঁর এলাকার প্রতিটি কোণ সবুজে না ভরিয়ে দেওয়া পর্যন্ত যেন তাঁর স্বস্তি নেই। (ডেস্ক)