(দিনাজপুর২৪.কম) প্রতিবারের মতো এবারও সরকারি রেটের দোহাই দিয়ে ঈদে ঘরমুখো মানুষকে জিম্মি করে লঞ্চ ভাড়া বৃদ্ধি করছেন লঞ্চ মালিকরা। এরই মধ্যে রাজধানী ঢাকার সঙ্গে বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের ২৮টি রুটে চলাচলকারী লঞ্চগুলোর যাত্রী ভাড়া ৫৫ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা। ঈদের ৭ দিন আগে থেকে কার্যকর হবে বর্ধিত রেটের এ ভাড়া। চলবে ঈদের পরও টানা অন্তত ১০ দিন। এদিকে নৌ মন্ত্রণালয়সহ সরকারের নানা দফতরকে শুভংকরের ফাঁকিতে ফেলে এ ধরনের হঠকারী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছেন বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের সাধারণ যাত্রীরা। একাধিক নাগরিক সংগঠনের নেতাও একই দাবি জানিয়েছেন সরকারের প্রতি। প্রতিবছর ঈদে এ নিয়ে পত্র-পত্রিকায় ব্যাপক লেখালেখি হলেও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকে।

 বছরজুড়ে মাথাপিছু ২০০ টাকা ভাড়ায় ঢাকা-বরিশাল রুটে যাতায়াত করেন ডেক শ্রেণীর যাত্রীরা। সিঙ্গেল কেবিনের ভাড়া ৯০০ এবং ডাবল ১ হাজার ৭০০ টাকা। এর বাইরে কিছু কিছু লঞ্চে সোফা এবং ভিআইপি কেবিনের ব্যবস্থা থাকলেও এসব শ্রেণীর যাত্রীসংখ্যা একবারেই হাতেগোনা। সারা বছর এই রেটে ভাড়া আদায় চললেও ঈদ এলেই পাল্টে যায় সব। সরকারি রেটের কথা উল্লেখ করে ভাড়া বাড়িয়ে দেন মালিকরা। বিষয়টি যে বেআইনি তাও নয়। ঢাকা-বরিশাল রুটের ডেক যাত্রীদের জন্য সরকার নির্ধারিত ভাড়া হচ্ছে ২৫৮ টাকা। বিধান অনুযায়ী প্রথম শ্রেণীর প্রতি আসনের ভাড়া হবে এর চার গুণ। সেই হিসাবে সিঙ্গেল কেবিনের ভাড়া ১ হাজার ৩২ এবং ডাবল কেবিনের ভাড়া ২ হাজার ৬৪ টাকা হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বছরজুড়ে যাত্রীদের কাছ থেকে এই হারে ভাড়া নেয় না লঞ্চগুলো। শুধু ঈদের সময়ই চলে সরকারি রেটে ভাড়া আদায়। এ বছরও সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মালিকরা।
 বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থার সহসভাপতি বরিশাল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান রিন্টু জানান, ঈদের সময় ডেকের ভাড়া ২৫০, সিঙ্গেল কেবিনের ভাড়া ১০০০ এবং ডাবল কেবিনের ভাড়া ২০০০ টাকা করে নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। একই হারে বর্ধিত ভাড়া নেয়া হবে সোফা এবং ভিআইপি কেবিনে। সে ক্ষেত্রে ভিআইপি কেবিনের ভাড়া বাড়বে গড়ে ১ থেকে দেড় হাজার টাকা।
 ঈদের সময় কেন এই ভাড়া বৃদ্ধি- জানতে চাইলে যথারীতি সরকারি রেটের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। সারা বছর কম ভাড়ায় যাত্রী নিলেও ঈদের সময় বাড়তি খরচ থাকায় ভাড়া বৃদ্ধি করতেই হয়।
 লঞ্চ মালিকরা যেখানে আটঘাঁট বেঁধে তৈরি ভাড়া বাড়াতে, সেখানে বছরের পর বছর ধরে চলা এই যাত্রী জিম্মিকরণ প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে বলতে গেলে আজ পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থাই নেয়নি সরকার। এ বছরও দৃশ্যমান একই পরিস্থিতি। যার প্রতিফলন ঘটেছে ঈদ উপলক্ষে নৌপথে যাত্রী পরিবহন প্রসঙ্গে গত সপ্তাহে ঢাকায় অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয়ের বৈঠকেও। বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা এবং আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর নেতৃস্থানীয় কর্মকর্তা ছাড়াও সেখানে উপস্থিত ছিলেন নৌপরিবহনমন্ত্রী এবং লঞ্চ মালিক সমিতির নেতারা।
 বৈঠকে ঈদে ঘরমুখো মানুষের নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সিদ্ধান্ত হলেও যাত্রী ভাড়া নিয়ে প্রতিবছর চলা এই জটিলতা প্রসঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি। যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে নানা কথা বলেছেন নৌপরিবহনমন্ত্রী। কিন্তু ঈদে বাড়তি ভাড়া আদায় নিয়ে কিছুই বলেননি তিনি।
 বরিশাল নাগরিক সমাজের সাধারণ সম্পাদক ডা. মিজানুর রহমান বলেন, এসব বৈঠকে সরকারি কর্মকর্তা এবং লঞ্চ মালিকরা উপস্থিত থাকলেও যাদের জন্য এ আয়োজন সেই জনসাধারণের কোনো প্রতিনিধি সেখানে রাখা হয় না। ফলে মন্ত্রী আর মালিকরা কিছু গৎবাঁধা বক্তব্য আর জনসেবার স্লোগান দিয়ে দায়িত্ব শেষ করেন। প্রতিবছরই রেডিও-টিভিতে শোনা যায় তাদের সেসব কথা। কিন্তু জনগণ কী চায় সেটা আর বলা হয় না।
 বরিশাল নাগরিক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক শ্রী মিন্টু বসু বলেন, সব সময় যে হারে ভাড়া নেয়া হয় ঈদের সময়ও সে হারেই ভাড়া নিক লঞ্চ মালিকরা। সরকারি রেটের দোহাই যদি দিতেই হয় তাহলে সারা বছর কেন কম নেয়া? সে ক্ষেত্রে ঈদের বাজেটে হিসাবের বাইরে হঠাৎ করে বাড়তি ব্যয়ের কোনো ঝামেলায় পড়তে হবে না ঘরমুখো মানুষের। একজন খেটে খাওয়া মানুষের জন্য ৫০ টাকা বাড়তি ভাড়া অনেক কিছু। ৫ জনের একটি পরিবারকে যদি ৫০ টাকা করেও বাড়তি দিতে হয় তাহলে অতিরিক্ত লাগবে ২৫০ টাকা। লঞ্চ মালিকদের পাশাপাশি সরকারেরও এটি ভাবা উচিত।
 বাংলাদেশ কলেজ শিক্ষক সমিতি, বরিশাল অঞ্চলিক শাখার আহ্বায়ক অধ্যাপক মহসিন উল ইসলাম হাবুল বলেন, এটি আসলে লঞ্চ মালিকদের এক ধরনের হঠকারিতা। সারা বছর লঞ্চ ভাড়া কম নেয়ার বিষয়ে তারা সদম্ভে বলেন যাত্রীসেবার কথা। কিন্তু নেপথ্যের কাহিনীটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। বছরজুড়ে লঞ্চ চলাচলের ক্ষেত্রে থাকে লঞ্চগুলোর প্রতিযোগিতা। এই অবস্থায় বেশি ভাড়া নিলে যাত্রী হারানোর ভয় থাকে বলেই কাজটি করে তারা। ঈদের সময় যেহেতু মাত্রাতিরিক্ত যাত্রীর চাপ থাকে, তাই জিম্মি করে চলে ভাড়া আদায়। তাছাড়া আরও একটি কারণ আছে, আশপাশের জেলাগুলো থেকে যেসব লঞ্চ ঢাকায় যাওয়া-আসা করে সেগুলো অপেক্ষাকৃত ছোট এবং কম বিলাসবহুল। এ ক্ষেত্রে ভাড়া বেশি রাখলে তারা ওই সব এলাকা থেকে এসে ওঠে বরিশালের লঞ্চে। এসব কারণেই সারা বছর ভাড়া কম রাখেন মালিকরা।
 যাত্রী এবং নাগরিক সংগঠনগুলোর নেতাদের এসব অভিযোগ নিয়ে আলাপকালে ঢাকা-বরিশাল রুটে চলাচলকারী কীত্তনখোলা লঞ্চের মালিক মঞ্জুরুল আলম ফেরদৌস দিনাজপুর২৪.কমকে বলেন, ঈদে যেমন প্রতিটা মানুষের অনেক বাড়তি খরচ থাকে তেমনি আমাদেরও পোহাতে হয় নানা ঝামেলা। কর্মচারীদের বোনাসসহ নানা খাতে ব্যয় হয় অতিরিক্ত টাকা। সারা বছর আমরা সরকার নির্ধারিত রেটের তুলনায় অনেক কম ভাড়ায় যাত্রী আনা-নেয়া করি। ঈদের সময় সেটা সম্ভব হয় না। তাছাড়া যাত্রীদের সুবিধার্থে লঞ্চগুলো ডাবল ট্রিপ দেয় প্রতি ঈদে। ঢাকা থেকে বরিশালে যাওয়ার সময় যাত্রী থাকলেও ফিরতি পথে আসতে হয় সম্পূর্ণ খালি। এ অবস্থায় ঈদের সময়ও যদি আমরা কম ভাড়ায় যাত্রী আনা-নেয়া করি তাহলে বাড়ি থেকে টাকা এনে কর্মচারীদের বেতন-বোনাস দিতে হবে। অতএব এ সময়ে সরকার নির্ধারিত রেটে ছাড়া কম ভাড়ায় যাত্রী পরিবহন সম্ভব নয়।

(ডেস্ক)