(দিনাজপুর২৪.কম) কুমিল্লার লাকসাম বাসস্ট্যান্ড। প্রতি মাসে ছোট্ট এ বাসস্ট্যান্ড থেকে চাঁদা উঠছে ২ লাখ টাকা। আর ঈদ মৌসুমে এ স্ট্যান্ড থেকে চাঁদা আদায় হচ্ছে তিন গুণ। লাকসাম বাসস্ট্যান্ডের চাঁদা বৃদ্ধির চিত্রটি এখন গোটা দেশের। অভিন্ন চিত্র লঞ্চ টার্মিনালেও। ঘাটে ঘাটে চাঁদার টাকা গুনতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।ফুটপাথ থেকে বিপণিবিতান, কাঁচা বাজার থেকে অফিস আদালত- নিস্তার নেই কোথাও। ভ্রাম্যমাণ বিপণিবিতান, মহাসড়ক- সর্বত্র চলছে নীরব-সরব চাঁদাবাজি। কোথাও তল্লাশির নামে পুলিশ করছে চাঁদাবাজি। আবার সন্ত্রাসীরা চাঁদা তুলছে অবৈধ অস্ত্র দেখিয়ে। কোনো কোনো স্থানে চাঁদা আদায়ে পুলিশ-সন্ত্রাসী সমানে সমান। শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নামেও মোবাইল ফোনে চাঁদাবাজি চলছে। রাস্তায় বাঁশ ফেলে পরিবহন আটকে যাত্রীদের কাছ থেকে চাঁদা তোলা হচ্ছে মসজিদ-মাদ্রাসার নামে। রাস্তায় রাস্তায় সাপ দেখিয়ে সাপুড়েদের চাঁদাবাজি যেমন বেড়েছে, তেমনি হিজড়ারাও চাঁদা তুলছে যাচ্ছে তা ভাবে। শুধু তাই নয়, ভিক্ষুকদেরও চাঁদা দিতে হচ্ছে কয়েক গুণ বেশি। ঈদকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে চলছে এমন অবিরাম চাঁদাবাজি। পরিবার-পরিজন নিয়ে মানুষ যখন খুশির ঈদ উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, ঠিক তখন সশস্ত্র চাঁদাবাজদের বেপরোয়া দৌরাত্ম্য সেই খুশি যেন আর খুশি থাকছে না। কখনো কখনো তা আতঙ্কে পরিণত হচ্ছে। এ বিষয়ে ঢাকায় বেশ কয়েকটি থানায় সাধারণ ডায়েরি হয়েছে। এ ছাড়া ডিবি, র‌্যাব ও পুলিশের বিভিন্ন দফতরে অসংখ্য অভিযোগ জমা পড়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অনেকেরই চাঁদা দিতে দিতে পুঁজিতে টান পড়ার উপক্রম। তেমনি রেহাই নেই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের। তারাও হাঁফিয়ে উঠেছেন চাঁদার টাকা গুনতে গুনতে। ভুক্তভোগী অনেক ব্যবসায়ী নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। চাঁদাবাজদের অত্যাচারে মোবাইল ফোনের সুইচও তারা বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন। গেল এক সপ্তাহে চাঁদাবাজি করতে গিয়ে পুলিশের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা গ্রেফতার হয়েছেন। প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও পুলিশের চাঁদাবাজির অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু থামছে না পুলিশের ওপেন সিক্রেট চাঁদাবাজি। চিহ্নিত সন্ত্রাসী চাঁদাবাজদের হামলায় ব্যবসায়ীসহ আহত হয়েছেন অন্তত অর্ধশত ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ। অধিকাংশ চাঁদাবাজির ঘটনার সঙ্গে সরকারি দলের অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা জড়িত। ইতিমধ্যে যুবলীগের বেশ কয়েকজন নেতা-কর্মী গ্রেফতার হয়েছেন চাঁদাবাজির অভিযোগে। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম রেজাকে বহিষ্কার করা হয় সংগঠন থেকে। এর পরও চাঁদাবাজি বন্ধ হয়নি। দেশের বিভিন্ন স্থানে গতকালও যুবলীগের নেতা-কর্মীরা ঈদ চাঁদাবাজিতে ছিলেন ব্যস্ত। কোথাও কোথাও তাদের হামলায় বেশ কয়েকজন আহতও হন। সংশ্লিষ্টরা বলেন, পুলিশের সঙ্গে সরকারি দলের অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ থাকায় তারা মিলেমিশে চাঁদাবাজি করছেন। ভুক্তভোগীরা বলছেন, পুলিশের শীর্ষ পর্যায় থেকে চাঁদাবাজি প্রতিরোধে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হলেও বাস্তবে এর প্রতিফলন নেই। উপরন্তু পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তাব্যক্তিরা এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে থাকেন। অনুসন্ধানে জানা যায়, ব্যবসায়ী, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি কর্মকর্তা ও নির্মাণাধীন বাড়ির মালিককে চিঠি দিয়ে বা ফোন করে চাঁদা চাওয়া হচ্ছে। চিরকুটে সন্ত্রাসীদের নাম ও ফোন নম্বরও দেওয়া হচ্ছে। চিরকুট পৌঁছে দেওয়া হয় বাড়ির দারোয়ান, পিয়ন ও কর্মচারীদের হাতে। চিরকুট নিতে দেরি হলে কিংবা নিতে না চাইলে গুলি বা মারধর করা হয়। আতঙ্ক ছড়াতে খামে পাঠিয়ে দেওয়া হয় কাফনের কাপড়।চাঁদাবাজদের নতুন গ্রুপ : রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে এমন অন্তত ৫০০ নতুন চাঁদাবাজ এখন সক্রিয় হয়ে উঠেছে। পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্রমতে, ঈদ চাঁদাবাজি দিয়েই অধিকাংশ সন্ত্রাসীর হাতেখড়ি হয় এ পথে। রাজধানীর মিরপুর, শাহআলী, দারুসসালাম, পল্লবী, কাফরুল, মোহাম্মদপুর, গুলশান, রমনা, উত্তরা, বাড্ডা, কোতোয়ালি, সূত্রাপুর, যাত্রাবাড়ী, জুরাইনসহ আরও অনেক এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে এমন চাঁদাবাজের সংখ্যা বেড়েছে। এরা বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে যাচ্ছে, হুমকি-ধমকি দিয়ে চাঁদা আদায় করছে। গোয়েন্দা পুলিশের একটি সূত্র জানায়, রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে এমন নতুন চাঁদাবাজ গজিয়ে উঠেছে। তাদের চেহারা অপরিচিত। নাম-ঠিকানা পাওয়া গেলেও তাদের খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। ওই কর্মকর্তা বলেন, নতুন এমন চাঁদাবাজদের মধ্যে মোহাম্মদপুর, আদাবর, শেখেরটেক এলাকায় বেশি অপরাধী তৈরি হয়েছে। এরা সরকারদলীয় স্থানীয় নেতা-কর্মীদের নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজি করছে। মোহাম্মদপুরের নতুন সন্ত্রাসীদের মধ্যে আদাবরের মেহেদীবাগ হাউজিং সোসাইটির ওবায়েদের নাম এখন সর্বাগ্রে। গাড়ি চালানোয় পারদর্শী ওবায়েদ সন্ত্রাসীদের সহযোগী হয়ে থাকতে থাকতে নিজেই হয়ে উঠেছে একজন পেশাদার সন্ত্রাসী। এ ছাড়া পল্লবী থানার ১১ ও ১২ নম্বর এবং বেনারসি পল্লীতে শাহাদত-খোরশেদের হয়ে চাঁদাবাজি করছে চান-আশিক, মামুন, মিজান। মোহাম্মদপুরে চাঁদাবাজি করছে হালিম, হাসু, পিয়ারুল, মামুন ওরফে পরকা মামুন, মুরগি টিপু, আবদুস সাত্তার, বাবু ওরফে এক্সেল বাবু, রুবেল ওরফে রুমেল, সুমন, কামরুল হাসান, শাহ মোহাম্মদ মজিদ, আনোয়ার হোসেন সিন্টু ও ফরিদ। ধানমন্ডিতে চাঁদাবাজি করছে বাবু, সোহেল, জমির, সুলতান, সিরাজ, স্বপন, আরিফ, চান্দু, আকরাম। তেজগাঁওয়ে আশিকবাহিনী, সাইদুল, সায়েম, বাদল, মনির, বিপ্লব, বাবুল, খোকন; সবুজবাগে মঞ্জুরুল ইসলাম, কাজল, সাত্তার, জুয়েল, বাবু; যাত্রাবাড়ীতে সজল, রনি ও জোবায়ের পুলিশের খাতায় চাঁদাবাজ। এ রকম আরও অসংখ্য নাম আছে পুলিশের তালিকায়।পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি : দেশের পরিবহন খাতে এখন চলছে বেপরোয়া চাঁদাবাজি। এ চাঁদাবাজি চলছে সড়ক-মহাসড়কের সর্বত্র। বাঁশ ফেলে সড়কের বিভিন্ন পয়েন্ট, বাস টার্মিনাল, ফেরিঘাটসহ বিভিন্ন স্থানে প্রতিটি পরিবহন থেকে যে মোটা অঙ্কের চাঁদা তোলা হচ্ছে, তা ভাগবাটোয়ারা হয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর মধ্যে। চাঁদার হারেও অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। যাত্রীবাহী বাস-মিনিবাস, পণ্যবাহী ট্রাক-কাভার্ডভ্যান, মালবাহী লরি, মিনি ট্রাক, ম্যাক্সি, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইক- কোনো কিছুই বাদ যাচ্ছে না চাঁদাবাজির আওতা থেকে। বিভিন্ন সংগঠনের নামে ২০০ থেকে ৩০০০ টাকা পর্যন্ত তোলা হচ্ছে চাঁদা।পরিবহন খাতের চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক বিশাল নেটওয়ার্ক। পুলিশ, মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলো, স্থানীয় মাস্তান, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ, ফেরিঘাট শ্রমিক ইউনিয়ন, ট্রাফিক পুলিশ, যানজট নিরসন ও শ্রমিকদের কল্যাণ কমিটির কর্তাব্যক্তি- এদের সবাই জড়িত এ অপরাধের সঙ্গে। অথচ পরিবহন খাতের চাঁদাবাজির মাশুল গুনতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।ফুটপাথের চাঁদা চার গুণ বেশিরাজধানীজুড়ে পসরা সাজিয়ে বসা ফুটপাথের হকারদের কাছ থেকে পুলিশ-সন্ত্রাসী মিলেমিশে চাঁদাবাজি করছে। এই রমজানে হকারদের কাছ থেকে চাঁদার টার্গেট ৩০ কোটি টাকারও ওপর। বছরের অন্য সময়গুলোর তুলনায় রমজানে প্রতিদিন হকারদের কাছ থেকে চাঁদা তোলা হচ্ছে চার গুণেরও বেশি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে চাঁদা তোলার দায়িত্বে থাকা একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন, রোজার আগে প্রতি হকারকে রোজ দিতে হতো ১০০ টাকা। ঈদ সামনে রেখে এখন তোলা হচ্ছে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা করে।হাইওয়েতে চাঁদাবাজি : বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, দেশের প্রায় প্রতিটি মহাসড়কেই চাঁদাবাজি চলছে। ঢাকা-আরিচা, ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেটসহ সব কটি মহাসড়কেই ধুমছে চাঁদাবাজি হচ্ছে। হাইওয়ে পুলিশ গাড়িচালকদের কাছ থেকে বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে ৫০০ থেকে শুরু করে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে। নিরাপত্তার নামে হাইওয়ে পুলিশ করছে পকেট বাণিজ্যের কাজ। আর এতে হয়রানির শিকার হচ্ছেন ওই সব যানবাহনের চালক ও মালিকরা। বিভিন্ন সড়কে ট্রাক, লরি, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, বাস ও পিকআপ ভ্যান থেকে এ চাঁদাবাজি করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। যানবাহন নিয়ন্ত্রণের জন্য নিয়োগ দেওয়া ট্রাফিক পুলিশ কাজ বাদ রেখে চাঁদাবাজি করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে মহাসড়কে প্রতিনিয়ত তীব্র যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে।তল্লাশির নামে চাঁদাবাজি : ঈদ যতই ঘনিয়ে আসছে পুলিশ ততই বেপরোয়া হয়ে উঠছে। ঈদ সামনে রেখে ডিএমপিসহ সারা দেশে পুলিশের তল্লাশির নামে চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্ট ও মহাসড়কগুলোয় তল্লাশির নামে পুলিশের চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটছে।রূপগঞ্জে ২০ টাকার চাঁদা ২০০ : নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে স্থানীয় পরিবহন শ্রমিক নেতাদের দাবি করা চাঁদার টাকা না দেওয়ায় দুই প্রাইভেট কার চালককে পিটিয়ে গুরুতর আহত করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। গতকাল দুপুরে উপজেলার গোলাকান্দাইল প্রাইভেট কার স্টেশন এলাকায় ঘটে এ ঘটনা। প্রাইভেট কার চালকদের কাছে ২০ টাকার স্থলে ২০০ টাকা চাঁদা দাবি করে চাঁদাবাজরা। এক পর্যায়ে প্রাইভেট কার চালকরা বাড়তি চাঁদার টাকা দিতে অস্বীকার করেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে চাঁদাবাজরা লাঠিসোঁটা নিয়ে চালকদের ওপর হামলা চালায়। তারা পিটিয়ে গুরুতর আহত করে নয়ন মিয়া ও হজরত আলী সরল নামে দুই প্রাইভেট কার চালককে।    (ডেস্ক)