(দিনাজপুর২৪.কম) মস্কোর রেড স্কয়ারে ৯ই মার্চ রাশিয়ার বিজয় দিবস কুচকাওয়াজে যখন একের পর এক মিশাইল উন্মোচিত হচ্ছিল, তখন প্রেসিডেন্ট ভ¬াদিমির পুতিনের পাশেই সটান হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু। সিরিয়ায় ইরানকে রুখতে রাশিয়ার সমর্থন নিশ্চিত করা প্রয়োজন ছিল নেতানিয়াহুর। সেজন্যই তখন রাশিয়া সফরে ছিলেন তিনি। আর তা দৃশ্যত কাজেই লেগেছে। ঠিক ওই সময়ে রাশিয়া ও ইসরাইল একটি চুক্তি চুড়ান্ত করার দ্বারপ্রান্তে ছিল। এই চুক্তির মাধ্যমেই ইসরাইলের সিরিয়া-ঘেঁষা সীমান্ত থেকে মাত্র ১৫ মাইল দূরে ঘাঁটি গাড়া ইরানি বাহিনীকে দূরে রাখা সম্ভব হয়। মধ্যপ্রাচ্যে পুতিনকে যেই সুনিপুণ ভারসাম্যের খেলা খেলতে হচ্ছে, তা ওই চুক্তির মাধ্যমেই বোঝা যায়। দ্য ইকোনমিস্টের এক বিশ্লেষণীতে এমনটা বলা হয়েছে।
২০১৫ সালের শেষ নাগাদ সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে হস্তক্ষেপ করে রাশিয়া। তখন থেকেই সেখানে রাশিয়ার অবস্থান খুবই অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। গৃহযুদ্ধে জড়িত প্রায় সব পক্ষই রাশিয়ার সঙ্গে আলাপ করেই টিকে আছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ইসরাইলের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রেখেছে রাশিয়া। এমনকি দুই দেশের জোরালো সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কও আছে। আবার একই সাথে ইসরাইলের চিরশত্রু ইরানের সঙ্গেও রাশিয়ার সম্পর্ক ভীষণ ভালো। ইরান আবার সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে টিকিয়ে রাখতে রাশিয়ার প্রধান সহযোগী।
কিন্তু সিরিয়ায় যুদ্ধের তীব্রতা যেহেতু হ্রাস পেয়েছে, রাশিয়া হয়তো ভাবছে যে ইরানকে এখন আগের মতো তার প্রয়োজন নেই। অতীতে যখন ইরান-সমর্থিত লেবানিজ সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে ইরান অস্ত্রসস্ত্র পাঠিয়েছে, তখন তাতে হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। কিন্তু রাশিয়া তখন অত গা দেয়নি। আবার ইরান যখন সিরিয়ায় স্থায়ী ঘাঁটি গাড়ার চেষ্টা করছে, ইসরাইল তখন ইরানি স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। এমনকি মস্কোর ওই কুচকাওয়াজের রাতেও ইসরাইল ইরানি বাহিনীর ওপর কয়েক ডজন বিমান হামলা চালিয়েছে। অথচ, সিরিয়ায় অবস্থিত রাশিয়ান বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তখন নিশ্চুপ ছিল। কিছু ইরানি সন্দেহ করছেন যে, সিরিয়ায় ইরানি ঘাঁটির অবস্থান নেতানিয়াহুকে জানিয়ে দিয়েছেন পুতিনই!
ইরানি বাহিনী মোতায়েন ঠেকাতে ইসরাইল ও রাশিয়ার মধ্যকার চুক্তি কার্যকর হবে কিনা, তা দেখার সময় এখনও আসেনি। যুদ্ধ শেষ হলে সিরিয়া থেকে বিদেশী বাহিনীকে চলে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন পুতিন। তবে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী রক্ষী বাহিনীর অভিজাত শাখা কুদস ফোর্স সিরিয়ায় রয়ে যেতে দৃশ্যত দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
অপরদিকে রাশিয়া ও ইসরাইলের স্বার্থ ক্রমশই অভিন্ন হয়ে উঠছে। এক জ্যেষ্ঠ ইসরাইলি কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে রাশিয়ার বোঝাপড়া ভালো। আমরা সিরিয়ায় ফের আরেকটি রাজনৈতিক সংঘাত ঠেকাতে পারবো। আমরা যতটা বুঝতে পারছি, আসাদই সেখানে শাসন চালিয়ে যাবে।’
সিরিয়ার সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে থাকা বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর জন্য এটা বেশ দুঃসংবাদ। এই গোষ্ঠীগুলোকে খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও হালকা অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করেছে ইসরাইল। তবে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর কমান্ডাররা বলছেন, ইরান সমর্থিত মিলিশিয়ারা ইতিমধ্যে পিছু হটতে শুরু করেছে। তাই আসাদ বাহিনীর আক্রমণ শিগগিরই হতে পারে। রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ বলেছেন, ‘শুধু সিরিয়ান আরব রিপাবলিক আর্মিই সিরিয়া-ইসরাইল সীমান্তে থাকতে পারা উচিত।’ তবে ইসরাইল হয়তো এতেই সন্তুষ্ট হবে না।
সিরিয়ার অন্যান্য অঞ্চলে ইরানি বাহিনী এখনও সক্রিয়।  ফেব্রুয়ারিতে ইসরাইলি আকাশসীমায় প্রবেশ করা ইরানি ড্রোনটি উড়ানো হয়েছিল সীমান্ত থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দূরে।
যদি আসাদ ও তার পৃষ্ঠপোষক রাশিয়া ইরানকে রুখে দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে ইসরাইল থেকে দেশটিতে আরও হামলা হওয়ার ঝুঁকিই বেশি। সেসব শুধু ইরানি স্থাপনাতেই হবে না। ইসরাইলি কর্মকর্তা উদাহরণ হিসেবে বলছেন, ১০ই মে ইসরাইলি বিমান থেকে সিরিয়ার বিমান-প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপরও হামলা চালানো হয়েছে, যেটি সিরিয়াকে দিয়েছিল রাশিয়া।
ফলে রাশিয়ার জন্য ভারসাম্য রক্ষার কাজ ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠতে পারে। সবার সঙ্গে আলোচনা করার কৌশল আগে পরে অকার্যকর হবেই। ফলে একটা পর্যায়ে এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে যে, কঠিন সিদ্ধান্তই নিয়ে নিতে হবে। হয় এসপার, নয় ওসপার। -ডেস্ক