নঈম নিজাম(দিনাজপুর২৪)রিমঝিম বৃষ্টি হচ্ছে। আকাশ ফেটে ফেটে পানির ঝরনা। এবার বর্ষাটা অন্যরকম। ছোটবেলা থেকে বর্ষা আমাকে আকর্ষণ করত। রবিঠাকুরের বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল মুগ্ধ করত। বৃষ্টিভেজা গন্ধরাজের ছোঁয়া অবিভূত করত আমাকে। মানুষ এখন প্রকৃতির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয় না। বরং মানুষ নিজেই ধ্বংস করে দিচ্ছে প্রকৃতিকে। এ কারণে প্রকৃতি নিজেও মাঝে মাঝে বিদ্রোহ করে। পৃথিবীতে নামিয়ে দেয় খরা, বন্যা, ভূমিকম্পের দুর্যোগ। সব কিছুতে এক নিষ্ঠুরতা। জগৎ সংসার, রাজনীতি, অর্থনীতির ভয়াবহ অবক্ষয়। অথচ কেউ বোঝার চেষ্টা করে না কোনো কিছু চিরস্থায়ী না। আজ যা বাস্তব, কাল তা কঠিন কিছু। আজকের সিদ্ধান্ত কালই পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে প্রিয় মানুষের কাছে। কারণ ইতিহাস সব সময় নির্মম। ১৯২৯ সালে স্ট্যালিন তার দেশের সব ধনী কৃষক ও জোতদারের খামার বিলুপ্তির নির্দেশ দেন। কারণ তার মতে, কম্যুনিজম বিস্তারে ভূস্বামীরাই বাধা। স্ট্যালিন তাদের দেখতেন পুঁজিবাদের প্রতীক হিসেবে। স্টালিনের এই নির্দেশ ছিল নিষ্ঠুর ও ভয়ঙ্কর। কারণ তিনি বলেছিলেন, বোমা মেরে জোতদারের সমস্ত খামার, ক্ষেতের ফসল, গবাদিপশু, ঘোড়া উড়িয়ে দাও। অনেক দিন পর এ প্রসঙ্গে ক্রুশ্চেভ ভিন্নমত পোষণ করেছিলেন ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের সঙ্গে আলাপকালে। ব্যক্তিগত জীবনে ক্রুশ্চেভ ছিলেন স্টালিনের খুবই আস্থাভাজন। ক্রুশ্চেভ বলেছিলেন, ‘স্ট্যালিনের একটি নির্দেশে সোভিয়েত ইউনিয়নে কমপক্ষে ১০ মিলিয়ন চাষি পরিবার ধ্বংস হয়।’ শুধু ক্রুশ্চেভ নন, আরও অনেক কমিউনিস্ট নেতা পরে এর সমালোচনা করেছিলেন। অথচ স্টালিন তার এই সহযোগীদের নিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সমাজতন্ত্রের বিকাশে। তিনি যা প্রতিবন্ধকতা মনে করেছিলেন তা উড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কালের বিবর্তনে এখন মনে হচ্ছে, এভাবে রাষ্ট্রের সম্পদ ধ্বংসের কোনো মানে হয় না। অথচ রাজনীতির প্রয়োজনে অনেক কঠিন সিদ্ধান্ত অনেক সময় নিতে হয়। কিন্তু সব সময় সঠিক হয় না। তারপরও রাজনৈতিক দলকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
সিদ্ধান্ত না নিয়ে রাজনৈতিক দল চালানো যায় না। একবার ভুল সিদ্ধান্ত নিলে তার খেসারত দিতে হয়। তবুও কঠিন সব সিদ্ধান্ত নিতে হয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আওয়ামী লীগ সবচেয়ে প্রাচীন। অনেক কাঠিন্য ভেদ করে দলটি আজকের অবস্থানে। এই দলের এক কঠিন সময় ছিল ১৯৭৯ সাল। বড় দুঃসময় তখন আওয়ামী লীগের। শুধু বঙ্গবন্ধুকে হারানো নয়, দলের নেতা-কর্মীরাও ভালো ছিলেন না। মামলা, হামলায় বেশির ভাগ নেতা-কর্মী পলাতক। ছাত্রলীগ, যুবলীগের বিরুদ্ধে হুলিয়া। আওয়ামী লীগের নেতারা নিষ্ক্রিয়। এর মধ্যে সামরিক শাসনকে বৈধ করতে সংসদ নির্বাচনের ঘোষণা। নির্বাচনে অংশ নেওয়া নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত আওয়ামী লীগ। কিন্তু বসে ছিল না জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ। তারা ঘোষণা দেয় নির্বাচনে যাবে। আ স ম রব কারাগারে। তিনিসহ অনেক নেতা এই মতের সঙ্গে একমত নন। তারপরও দলের বিকাশে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিলেন শাজাহান সিরাজ, মীর্জা সুলতান রাজাসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের বড় অংশ। সরকারের ভিতরে চক্রান্ত হয় মিজান আওয়ামী লীগ ও জাসদকে নির্বাচনের মাধ্যমে লাইমলাইটে রাখার। তাহলে আওয়ামী লীগকে পুরোপুরি দমন করা যাবে। এর মধ্যে গুজব ছড়িয়ে পড়ে মিজানুর রহমান চৌধুরীর আওয়ামী লীগকে নৌকা প্রতীক দেওয়া হবে। এই গুজব প্রভাব ফেলে আওয়ামী লীগে। পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য কয়েক দফা বৈঠক করেন মূল আওয়ামী লীগ নেতারা। দলের কঠিন পরিস্থিতি সামাল দিতে শেষ পর্যন্ত তারা সিদ্ধান্ত নেন সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার। তখন দলের সভাপতি আবদুল মালেক উকিল। সাধারণ সম্পাদক আবদুর রাজ্জাক। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নির্বাচনে যায় আওয়ামী লীগ। আসন পায় ৩৯টি।

আগেই বলেছি সময়ের প্রয়োজনে রাজনৈতিক দলকে অনেক কিছু করতে হয়। আওয়ামী লীগ ‘৭৯ সালে নির্বাচনে গিয়েছিল সময়ের প্রয়োজনে। ক্ষমতায় আসার জন্য নয়। শুধু তাই নয়, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী করেছিল ড. কামাল হোসেনকে। কারণ দলকে ধরে রাখতে, রাজনীতির সমন্বয় করতে, কর্মীদের চাঙ্গা রাখতে। এ প্রসঙ্গে আরেকটা গল্প না বলে পারছি না। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের বিত্তবান পরিবারের সন্তান জহিরুল কাইউম বাচ্চু মিয়া ছিলেন বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা জীবনের সঙ্গী। কলকাতার বেকার হোস্টেলে তারা একসঙ্গে থাকতেন। দীর্ঘ সময় তিনি আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ ছিলেন। ‘৭৯ সালের সংসদ নির্বাচনে জহিরুল কাইউম বাচ্চু মিয়ার নির্বাচন করার কথা ছিল। কিন্তু সমস্যা দেখা দিল তার ভাতিজা জিয়াউর রহমানের শিক্ষামন্ত্রী কাজী জাফর আহমেদকে নিয়ে। মানুষের কাছে জনপ্রিয় ছিলেন বাচ্চু মিয়া। কিন্তু ভাতিজা চাচাকে ছাড় দেবেন না। তাই চাচা নিলেন নতুন কৌশল। চৌদ্দগ্রামের পশ্চিমাঞ্চলের একটি বড় অংশের মানুষ তখন চরম অবহেলিত, বঞ্চিত। হোমনাবাদ নামে খ্যাত এ অংশটি এখন নাঙ্গলকোট উপজেলায় সম্পৃক্ত। এই বঞ্চিত এলাকার একজন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদিন ভূঁইয়াকে তিনি খবর পাঠালেন নির্বাচন করার জন্য। বাহক আরেকজন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় মেতেছিলেন জয়নাল ভূঁইয়া। বাহক এসে বলল, আপনাকে নেতা খুঁজছেন এমপি করার জন্য। জয়নাল ভূঁইয়া বললেন, নির্বাচন করবেন তিনি। আমাকে খুঁজছেন কাজ করার জন্য। আমি যাব পরে। সমস্যা নেই। আগত ব্যক্তি বললেন, না এখনই যেতে হবে। কি আর করা। আড্ডা ভাঙার মন খারাপি নিয়ে জয়নাল আবেদিন গেলেন তার নেতা বাচ্চু মিয়ার কাছে। তাকে পেয়েই আড়ালে ডেকে নিলেন বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর। বললেন, তৈরি হও। তোমাকে দিয়ে এমপি নির্বাচন করাব জাফরের বিরুদ্ধে। যে কথা সেই কাজ। টাকা-পয়সার ব্যবস্থাও করেন বাচ্চু মিয়া। নিজে মাঠে নেমে কাজ করেন। শেষ পর্যন্ত জয়ী করেন মাটি থেকে উঠে আসা জয়নাল আবেদিন ভূঁইয়াকে। ‘৭৯ সালে আওয়ামী লীগের ৩৯ জন এমপির একজন ছিলেন তিনি। সেই আওয়ামী লীগ আর নেই। সেই নেতাও নেই। এখন চারদিকে সুবিধাবাদীদের ঠাট। নবাগত, বহিরাগত ও হাইব্রিডরা সবক দেন ত্যাগী নেতা-কর্মীদের। ২০০১ সালের পর সুধা সদনে যে মুখগুলোকে দেখেছিলাম তারাও নেই।

আওয়ামী লীগের ইতিহাস এমনই। একদল লোক তৈরি করে। আরেক দল ভোগ করে। বঙ্গবন্ধু সারা জীবন কষ্ট করেছেন। জেল, জুলুম, হুলিয়াতে ছিলেন। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে তিনি ভোগ করতে পারলেন না। এক সময় মিজানুর রহমান চৌধুরী ও আমেনা বেগম আওয়ামী লীগ অফিসে বাতি জ্বালিয়ে রেখেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর আত্দজীবনীতে আওয়ামী লীগের অনেক কঠিন সময়ের কথা আছে। দুঃসময়ে একজন নেতা কীভাবে সব সামাল দিয়েছেন তা আছে। আওয়ামী লীগের কর্মীদের জন্য এই বইটি বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। আমাদের পাঠ্যবইয়ে বঙ্গবন্ধুর আত্দজীবনী রাখা দরকার। এতে বাংলাদেশের আগামী প্রজন্ম লাভবান হবে। একজন নেতা উঠে আসেন অনেক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। হঠাৎ করে উড়ে এসে দলের নেতৃত্ব দখল করার মধ্যে সাময়িক আনন্দ থাকতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি কিছু থাকে না। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, আওয়ামী লীগের মতো দলে কখনো হাইব্রিড দরকার নেই। ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটিতে নেতৃত্ব আসবে কর্মীদের মাধ্যমে। নেতা-কর্মীর মূল্যায়ন হবে কাজের মাধ্যমে। তোষামোদ করে পদ-পদবির পরিণাম ভালো হয় না।

একটা সময় রাজনীতিতে কাজের মূল্যায়ন হতো। এখন মূল্যায়ন হয় চাটুকারিতার। মাঠ থেকে কেন্দ্র সবখানে তোষামোদকারীদের উল্লাস। ষাটের দশকের মাঝামাঝি জ্যোতিবসু জেল থেকে বের হয়ে মালদহে যান। প্রফুল্ল চন্দ্র তখন মুখ্যমন্ত্রী। তার কেবিনেটের রাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন সৌরিন মিশ্র। তার দাপট তখন মালদহে। মন্ত্রী ডেকে রিকশা থেকে ট্যাঙ্চিালক সবাইকে বলে দিলেন, জ্যোতি বাবুকে কেউ তাদের গাড়িতে চড়াতে পারবে না। মন্ত্রীর নির্দেশ বলে কথা। গাড়িচালকদের ঘাড়ে কয় মাথা তারা এই নির্দেশ অমান্য করবে। গনি খান চৌধুরী তখন মালদহ কংগ্রেস নেতা। দলীয় মন্ত্রীর এই সিদ্ধান্ত তিনি মানলেন না। রেলস্টেশনে তিনি নিজের গাড়ি পাঠিয়ে দিলেন। জ্যোতি বসু মালদহে দুই দিন সভা-সমাবেশ করলেন কংগ্রেস নেতার গাড়ি চড়ে। শুধু তাই নয়, এক রাতে তার বাড়িতে খাওয়া-দাওয়াও করলেন। যথারীতি অভিযোগ গেল উচ্চ পর্যায়ে। চিঠি চালাচালির একপর্যায়ে মুখ্যমন্ত্রী ডেকে নিয়ে ধমক দিলেন সৌরিন মিশ্রকে। পাশাপাশি রাজ্য কংগ্রেসের কোষাধ্যক্ষ শূন্যপদে নিয়োগ দিলেন গনি খানকে। রাজনীতিতে এখন এই শ্রদ্ধাবোধ নেই। বাংলাদেশে কেন পশ্চিমবঙ্গেও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে অনেক পরিবর্তন। নেতারা এক সময় পরস্পরকে শ্রদ্ধা করতেন। কান কথার কোনো জায়গা ছিল না। বলিষ্ঠ নেতৃত্ব সব সময় জনকল্যাণের চিন্তা করত। অন্য দলের নেতাকে ধ্বংস করার জন্য আগে করা হতো তিরস্কার। এখন দেওয়া হয় পুরস্কার।

সেদিন বিএনপির এক নেতা আমার অফিসে এলেন। বললেন, ভাই রাজনীতি করতে আর ভালো লাগছে না। এখন রাজনীতিতে স্বাভাবিক ভদ্রতাবোধটুকু চলে যাচ্ছে। আমরা কেউ কাউকে সম্মান করি না। বিএনপি নেতা আরও বললেন, ওয়ান-ইলেভেনের পর জেলখানাতে তিনি, ওবায়দুল কাদের, মহীউদ্দীন খান আলমগীর, লোটাস কামাল একসঙ্গে ছিলেন। তাদের সঙ্গে দিন-রাত আড্ডা হতো। তারা আলাপ করতেন স্বাভাবিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি হলে হিংসার রাজনীতি আর আসবে না। ক্ষমতায় যারাই আসুক সম্পর্ক হবে পারস্পরিক শ্রদ্ধার। আমি বললাম, রাজনীতিবিদরা মনে করেন ক্ষমতা চিরস্থায়ী। আপনারা ক্ষমতায় থাকার সময় সাবের হোসেন চৌধুরীর বিরুদ্ধে প্লেট চুরির মামলা দিয়েছিলেন। সোহেল তাজের মতো ভদ্র, মার্জিত এমপিকে রাস্তায় পিটিয়ে রক্তাক্ত করেছেন। ওসব ভুলে গেলে চলবে না। বিএনপি নেতা বললেন, ভাই আমরা ভুল করেছি। আর ভুল করেছি বলেই এখন সংসদ, রাজপথ সবকিছু হারা। আমি আবারও বললাম, আপনারা ভুল বারবারই করছেন। আপনারা বাস্তবতায় এখনো নেই। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে ভুল করেছেন। টানা তিন মাস অবরোধের নামে হিংসার আগুনে পুড়িয়ে মারার রাজনীতিতে ভুল করেছেন। ভারতে গিয়ে লালগালিচা সংবর্ধনা নিয়ে ঢাকায় প্রণব মুখার্জির সঙ্গে সাক্ষাৎ না করে ভুল করেছেন। হেফাজত নিয়ে ভুল করেছেন। বিএনপি নেতা এবার জবাব দিলেন না। তবে বললেন, ভাই ওসবের সমাধান কী? এভাবেই কি সব চলবে? আমি বললাম, ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নেওয়াই ইতিহাসের শিক্ষা। রাজনীতিবিদরা কখনোই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেন না। তারা ইতিহাস তৈরি করেন। আবার নিষ্ঠুর খেসারতও দেন।

লেখক : সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।