ইতিহাসের কিছু ভয়ঙ্কর ভাইরাস - সংগৃহীত
ছবি-এস.এন.আকাশ, সম্পাদক, দিনাজপুর২৪.কম

এস.এন.আকাশ, সম্পাদক (দিনাজপুর২৪.কম) ভাইরাসের, বিশেষ করে বর্তমান বিশ্বের ভয়ঙ্কর করোনাভাইরাস নিয়ে আলোচনার আগে যে প্রশ্ন আসে, তা হলো ভাইরাস কী? এটা হলো ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পরজীবী (প্যারাসাইট), যা কোনো জীবন্ত কোষের ওপর ভর করে নিজেদের বিস্তৃতি ঘটায়। পরজীবী না পেলে এরা হারিয়ে যায়।
ভাইরাসের সংখ্যা অগণিত। আর এ অগণিত ভাইরাসের ব্যবহার হয় গালিতে, বিভিন্ন অনুভূতির প্রকাশে। এভাবেই অনুভব করা যায় এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পরজীবীগুলো কিভাবে সৃষ্ট জীবদের নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।

যেমন বক্তব্যের স্বাধীনতার কথাই ধরা যাক। এর নিয়ন্ত্রণের কর্মকাণ্ড চলে মানুষের জন্ম থেকেই। কোনো শিশু তার ইচ্ছামতো কিছু করতে পারে না। কারণ তার পিতা-মাতা, গুরুজনরা তা করতে দেন না। তাদের ভালোর জন্য অথবা নিয়ন্ত্রণের খাতিরে। আসলে এগুলোও ভাইরাসের অন্যতম প্রকাশ।

কিছু গুণীজন ও অনুসন্ধানীরা মনে করেন অর্থের প্রতি মানুষের প্রচণ্ড আকর্ষণ এই ভাইরাস থেকেই উৎসারিত। তাহলে এমনটি ভাবা কি অন্যায় হবে, যার কাছে যত সম্পদ আছে সে তত বড় ভাইরাস? বিশ্বের বর্তমানের চারজন ধনী কে? উইকিপিডিয়ার মতে, আমাজনের মালিক জেফ বেজোস (ধন ১১২ বিলিয়ন ডলার), বিল গেটস (৯০ বিলিয়ন ডলার), ওয়ারেন বুফে (৮৪ বিলিয়ন ডলার) এবং বার্নার্ড আরনল্ট (৭২ বিলিয়ন ডলার)। উল্লেখ্য, এক বিলিয়ন অর্থ হলো ১০০ কোটি। আরো উল্লেখযোগ্য যে, বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় ধনী হলেন বেজোসের সাবেক স্ত্রী ম্যাকেনজি। বিয়ে বিচ্ছেদের কারণে তাকে ৩২ বিলিয়ন ডলার দিতে হয়। উইকিপিডিয়ার তথ্য হলো ২০১৮ সালে বিশ্বে শতকোটি ডলার সম্পদ অধিকারীর সংখ্যা ছিল ২২০৮। এটি হিসাব করেছিল ফরবিস ম্যাগাজিন।

এরা কেমন করে ধনী হয়? একজন রম্যলেখক মন্তব্য করেছেন, ‘তারা ভাইরাস তৈরি করে; যা প্রতি সেকেন্ডে তার মালিকের জন্য সম্পদ আহরণ করে। যেমন অ্যামাজন ভাইরাস। কেউ অ্যামাজনে প্রয়োজনীয় তথ্যের জন্য বোতাম টিপল, তখনই তাকে সামান্য মূল্য দিতে হলো, যা তার কাছে এমন কিছু নয়। তবে প্রতি মুহূর্তে লাখ লাখ বোতাম টেপা হচ্ছে এবং অর্থ এর মালিকের কাছে যাচ্ছে। ভাইরাসের তথ্য জানতে গিয়ে এ যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী ‘গুগল’ সাহেবকে জিজ্ঞেস করা হলো। তাৎক্ষণিক তার জবাব এলো তিনি প্রদীপ্ত দেলোয়ারকে সামনে আনলেন। ইতিহাসের এই গবেষক প্রচুর পরিশ্রম করে সতেরোটি ভাইরাসের সন্ধান পেয়েছেন। এ তথ্যগুলো প্রমাণ করে ভাইরাসের উৎপত্তি সম্ভবত মানুষের উৎপত্তির সাথেই জড়িত। প্রদীপ্ত তার লিস্টের এক নম্বরে স্থান দিয়েছেন প্লেগ ভাইরাসকে। মজার কথা এ শব্দটি মানব সমাজের নানা ভয়ঙ্কর বাঁককেও বোঝায়। যেমন সমাজ এখন প্লেগগ্রস্ত। প্লেগের উৎপত্তি ১৩৪৬ সালে এবং ইঁদুর এর জীবাণু বহন করে। ইউরোপের ৩০-৬০ শতাংশ লোক মারা গিয়েছিল।

দ্বিতীয় স্থানে হলো ভ্যারিওয়ালা ভাইরাস, যা গুটিবসন্ত সৃষ্টি করে। বাংলাদেশেই এই রোগে লাখ লাখ মানুষ মৃত্যুবরণ করে। এর টিকা ১৭৯৬ সালে আবিষ্কৃত হলেও এর ব্যবহার ছিল সীমিত। ফলে ১৯৭০ সালে ভারতসহ বিভিন্ন দেশে এই বসন্ত মহামারীতে হাজার হাজার লোক মৃত্যুবরণ করে। বিশ্বব্যাপী এর প্রতিরোধের ফলে ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ বসন্তমুক্ত এলাকা বলে ঘোষণা দিতে পারে।
এর পরের মহামারী হলো ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস। এই ভাইরাসের উপস্থিতিও খ্রিষ্টপূর্ব শতাব্দী থেকে। প্রায় পাঁচ কোটি লোক এতে মারা যায় ১৯১৮-১৯ সালের মহামারীতে। সব ধরনের জমায়েত নিষিদ্ধ ঘোষণার মধ্য দিয়ে এ প্রতিরোধের কর্মকাণ্ড শুরু হয়।

পোলিও ভাইরাস ১৯০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে উৎপত্তি হয় বলে জানা যায়। সে দেশে সে বছরই ২৭ হাজার মানুষ মারা যায়। অন্যান্য দেশের হিসাব পাওয়া যায়নি। তবে এ মহামারীর বিস্তৃতি ছিল সেখানেও। ১৯৪০ সালে জোনাস সাল্ক এর টিকা আবিষ্কার করেন এবং ফলে পোলিও নিয়ন্ত্রণে আসে।
রিকট ভ্যালি ভাইরাস (আরভিএফ) কেনিয়ায় এই স্থানে ১৯৩১ সালে চিহ্নিত হয়। প্রধানত এ ভাইরাস পশুদের আক্রমণ করে। এসব পশুর দুধ খেলেও মানুষ আক্রান্ত হয়। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অবশ হয়ে পড়ে এবং আক্রান্ত পশু বা মানুষ মারা যায়।

ডেঙ্গু ভাইরাস ১৯৪৩ সালে আবিষ্কৃত হয় এবং সে বছর কয়েক হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করে। বাংলাদেশে মারা যায় ১১২ জন। এ রোগ এখন সুপরিচিত।
সিসিআইএফ (ক্রাইসিয়ান কস্টো হেমোরহেজিক ফিভার) ভাইরাসের উৎপত্তি ১৯৪৪ সালে কঙ্গোতে। ওটা সারা এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য আফ্রিকায় ছড়িয়ে পড়ে। এতে মৃত্যু হয় ৪০ শতাংশ।
জিকা ভাইরাস মশার কামড়ের মধ্য দিয়ে ছড়ায়। এর উৎপত্তি ১৯৪৭ সালে। এতে মারা যায়নি কেউ। উগান্ডার জিকা জঙ্গলের বানর থেকে এই ভাইরাসটি ছড়ায়। জার্মানির মারবুর্গ শহরে ১৯৬৭ সালে এক নতুন রোগ ছড়িয়ে পড়ে। পরে বেলগ্রেডেও দেখা দেয়। রোগটি ইবোলার মতো বাদুড় থেকে এসেছে বলে ধারণা করা হয়। ভয়ঙ্কর এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলে, ৮-১০ দিনের মধ্যে আক্রান্ত ব্যক্তি মারা যায়। এই ভাইরাসের নাম রাখা হয় মারবুর্গ ভাইরাস।

আফ্রিকার আরেক ভয়ঙ্কর ভাইরাস ইবোলা। ১৯৭৬ সালে প্রথম এর সন্ধান মেলে। আক্রান্ত ব্যক্তি ৫০-৭০ শতাংশ মারা যায়। ২০১৪-১৬ সালের মধ্যে আফ্রিকায় ১৯ হাজার লোক মারা যায়।
এইচআইভির সন্ধান পাওয়া যায় ১৯৮১ সালে। এটি রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা নষ্ট করে দেয় বলে আক্রান্ত ব্যক্তি ৫০-৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে মৃত্যুবরণ করে। এটা অবশ্য সংক্রামক রোগ নয়। ১৯৮১-২০০৬ সালের মধ্যে প্রায় আড়াই কোটি মানুষ মারা যায়। বাংলাদেশে প্রায় চার হাজার মানুষ এতে আক্রান্ত হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর কোনো ওষুধ বা প্রতিষেধক আবিষ্কৃত হয়নি।
অস্ট্রেলিয়ায় ১৯৯৪ সালে দেখা দেয় হেনেপা ভাইরাস। বাদুড় এটি ছড়ায় এবং সাধারণত ঘোড়া ও মানুষ আক্রান্ত হয়। ব্রিসবেনে ৭০টি ঘোড়া সে বছর মারা যায়। চারজন মানুষও মৃত্যুবরণ করে।
নিপাহ ভাইরাস বাংলাদেশে পরিচিত। কারণ লালমনিরহাটে এ ভাইরাসে এক শ’র বেশি মানুষ মারা যায়। ১৯৯৮ সালে প্রথম এটা মালয়েশিয়ায় শূকরের মধ্যে দেখা দেয়। সেখানে প্রায় ১০০ জন মৃত্যুবরণ করে। এর কোনো ওষুধ নেই।

সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিনড্রোম (সার্স) ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটে ২০০১ সালে চীনে। প্রায় ৮০০ লোক এতে মারা যায়। তবে ২০০৪ পর এর আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। তবে আক্রান্তের ৩৫ শতাংশ মারা যায়।

সৌদি আরবে ২০১২ সালে ছড়িয়ে পড়া সার্স (সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরিটরি সিনড্রোম) ভাইরাসে প্রায় ৮০০ লোকের মৃত্যু ঘটে।
সোয়াইন ফ্লুু বা সোয়াইন ইনফ্লুয়েঞ্জা শূকরের দেহ থেকে পাওয়া গেছে। এটির সংক্রমণ ঘটে ২০০৬ সালে। তখন এটি বিশ্বের ৭৪টি দেশে এক সাথে ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় দুই হাজার ৫০০ লোক মারা যায়।
এখন চলছে করোনাভাইরাসের তাণ্ডব। ১৯৬০ সালে প্রথমে মুরগির মধ্যে সংক্রামক ব্রঙ্কাইটিস ভাইরাসটির দেখা মেলে। এর আসল নাম করোনাভাইরাস ডিজিজ (কোভিড-১৯) ১৯৯০। চীন থেকে এটা ছড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যে ১৯০টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। বিভিন্ন পরীক্ষা শেষে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর উৎস হচ্ছে বাদুর ও সাপ। চীনের একাডেমি অব সায়েন্সের ধারণা এটি। এর আক্রমণে জ্বর, কাশি, গলা ফুলে যাওয়া বা সর্দির মতো উপসর্গ দেখা দিচ্ছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এর প্রধান শিকার হচ্ছে বয়স্করা।
করোনা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়লেও, এর মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি ইতালিতে, তার পরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলো। আক্রান্তের সংখ্যা ২ এপ্রিল পর্যন্ত ৯ লাখ ৩৭ হাজারের বেশি। মৃত্যু হয়েছে ৪৭ হাজারেরও বেশি জনের এবং সুস্থ হয়ে উঠেছেন এক লাখ ৯৪ হাজারের বেশি। অর্থাৎ আক্রান্তের ৪.৩৭% মৃত্যু ঘটেছে। এ তথ্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার।

তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে এ সংখ্যা আরো বড়। তারা সতর্কবাণীতে বলেছে, সংক্রমণের সংখ্যা শুধু যুক্তরাষ্ট্রে ৫৪ মিলিয়ন (৫ কোটি ৪০ লাখ) হতে পারে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের ২০১৭-১৮ সালে ফ্লু মৌসুমের ৬০ হাজার লোকের মৃত্যুর খবরের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

করোনার চিকিৎসা এবং প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরির জন্য বিভিন্ন দেশ চেষ্টা করলেও এ পর্যন্ত কোনো ওষুধ বা ভ্যাকসিন তৈরি হয়নি। কোয়ালিশন ফর এপিডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস ইনোভেশন (সেপি) সরকারের (মার্কিন) কাছে দুই বিলিয়ন ডলার চেয়েছে তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য। উল্লেখ্য, সেপি প্রতিষ্ঠা করে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম তাদের ১৯১৭ সালের ডাভোজ মিটিংয়ে। ধনকুবের বিল এবং মেলিন্ডা গেটস তৈরি করেছেন গাভী (গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ভ্যাকসিন অ্যান্ড ইমুইনাইজেসন)। এরা করোনা প্রতিরোধ ও ভ্যাকসিন কর্মসূচি বিশ্বব্যাপী চালাবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন এবং জনগণের সহযোগিতা ও সাহায্য চেয়েছেন। তারা অনুমান করছেন এতে খরচ হবে ৭.৩ বিলিয়ন ডলার। দুষ্টজনেরা বলছেন, বিশ্বের এই মরণব্যাধিকে প্রতিরোধের নামে গেটস কি তার বিশ বছরের সম্পদ বৃদ্ধির জন্য কাজ করবেন, না সত্যিই তা ছেড়ে দেবেন। বিখ্যাত অনুসন্ধানী ও লেখক পিটার কয়েনিগ সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেছেন, ‘জনগণকে জাগতে হবে এবং ঐক্যবদ্ধ হতে হবে যেন এই ধনী শোষক বা নতুন করে রোগ প্রতিরোধের নামে শোষণ না করতে পারে।’

বিশ্বে বারবার নানা ভাইরাস এসেছে এবং সাধারণ মানুষকে তার মূল্য দিতে হয়েছে। ধনবানরা তাদের নানা চক্র ব্যবহার করেছে তাদের সম্পদ বৃদ্ধিতে। করোনাভাইরাসও এক দিকে সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে তার আকাক্সক্ষা মেটাচ্ছে, অন্য দিকে ধনবানরা একে ব্যবহার করে আরো ধনী হওয়ার চেষ্টা করছে। ধন্য ভাইরাস, ভয়াবহ ভাইরাস।-ডেস্ক