আর্থিক সঙ্কটে শিক্ষক পরিবার আছে চাকরি হারানোর শঙ্কা

(দিনাজপুর২৪.কম) শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দীর্ঘ ছুটিতে বেতন পাচ্ছেন না বেসরকারি পর্যায়ের অনেক শিক্ষক-শিক্ষিকা। করোনার এ সঙ্কটে দিন যাচ্ছে তাদের সীমাহীন কষ্টে। লজ্জায় অনেকে আবার অন্যদের কাছে নিজের সঙ্কটের কথা বলতেও পারছেন না। সামাজিক মর্যাদার কথা চিন্তা করে মুখ বুজে সহ্য করতে হচ্ছে অনেক কিছুই। অন্য দিকে প্রতিষ্ঠানের আয়-রোজগার নেই এমন অজুহাতে বেতনভাতা না দেয়া বা কমিয়ে অর্ধেক বেতন দেয়ার ছুতা খুঁজছে মালিকপক্ষ। প্রতিষ্ঠান বন্ধ কিংবা চাকরি হারানোর শঙ্কাও প্রকাশ করছেন শিক্ষকদের কেউ কেউ।

দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিশেষত বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়, কিন্ডারগার্টেন, কোচিং সেন্টার, ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্লাস ও পরীক্ষা দুই মাস ধরে বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের বেতন বা টিউশন ফি আদায় করতে পারছেন না প্রতিষ্ঠানের মালিকপক্ষ। ফলে এর প্রভাব পড়ছে শিক্ষকদের বেতনভাতায়। অনেক শিক্ষক মে মাসের অর্ধেক বেতন পেলেও এপ্রিলে তারা কোনো বেতনভাতা পাননি। বেতনের জন্য এ সময়ে বেশি চাপ দিলে উল্টো প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়ারও হুমকি দেন অনেক মালিক। এ ছাড়া চাকরি থেকেও অনেককে বরখাস্ত করার হুমকিও দেয়া হয়।

দুই মাস ধরে প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো বেতন পাচ্ছেন না এমন কয়েকজন শিক্ষক জানান, আমরা অভাবের কথা না পারছি কাউকে বলতে, আবার না পারছি পরিবার পরিজন নিয়ে টিকে থাকতে। শিক্ষকতার মতো এমন একটি পেশায় থেকে এখন কাউকে নিজেদের অসহায়ত্বের কথা বলতে পারছি না। ঢাকা শহরে এমন অনেক যুবক আছেন যারা চাকরিতে যোগদানের আগে বেকারত্বের অভিশাপ ঘুচাতে প্রাইভেট বা টিউশনি করে জীবন চালান। কিন্তু গত দুই মাস ধরে প্রাইভেট বা টিউশনিও বন্ধ। ফলে তারা কষ্ট করে খেয়ে না-খেয়ে ঢাকা শহরে থাকছেন। তারাও তাদের কষ্টের কথা কাউকে বলতে পারছেন না।

একইভাবে বর্ণনাতীত আর্থিক কষ্টে রয়েছেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অবসরপ্রাপ্ত অনেক শিক্ষক পরিবারও। তারা অবসরভাতা পাওয়ার জন্য যোগাযোগ করেও সফল হচ্ছেন না। করোনার এ সঙ্কটের সময়ে দেশের বেসরকারি বিভিন্ন স্কুল-কলেজের লক্ষাধিক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক দ্রুততম সময়ে তাদের অবসরভাতা দাবি করেছেন। বাংলাদেশ কলেজ শিক্ষক সমিতির (বাকশিস) মহা-সম্পাদক ড. এ কে এম আব্দুল্লাহ জানান, আগে শিক্ষকদের অবসরভাতা পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতো। যদিও সেই সময় এখন অনেকটাই কমে এসেছে। তবে করোনার এ সময়ে সরকার শুধু একটি নির্দেশ দিলেই আমরা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকরা দ্রুত অবসরভাতা পেতে পারি। আমরা আশা করব সরকার এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেবে।

সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রীর সাথে দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় মালিকদের এক সভায় শিক্ষকদের বেতনভাতা না দেয়া বা কম দেয়ার বিষয়টি উঠে আসে। সভায় বলা হয় কোনো বিশ^বিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে শিক্ষকদের বেতন না দেয়ার অভিযোগ এলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। কিন্তু এরপরও অনেকে কৌশলে বেতন না দেয়ার পাঁয়তারা করছে বলে অভিযোগ আসছে।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত সোমবার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ না করার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ফোরাম। দ্রুততম সময়ের মধ্যে অর্থ পরিশোধ করার দাবি জানায় সংগঠনটি।
সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয়, কোভিড-১৯ মহামারেিত সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশের জনগণও চরম আতঙ্কে দিনযাপন করছে। অনেক মানুষের জীবন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে গত ১৭ মার্চ থেকে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণ দেখিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বেতন দেয়া হচ্ছে না বা আংশিক দেয়া হচ্ছে।

শিক্ষকরা জানান, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টিউশন ফি নিতে না পারায় বা নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ থাকায় আর্থিক সঙ্কটে রয়েছে বলে বিশ্ববিদ্যালয় পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) থেকে জানানো হয়েছে, এসব বিশ্ববিদ্যায়ের বার্ষিক আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী ন্যূনতম এক বছর শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দেয়ার মতো আর্থিক সক্ষমতা তাদের রয়েছে।

করোনা দুর্যোগকালীন বেতনের বিষয়টিকে ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে মানবিকভাবে দেখার আহ্বান জানিয়েছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ফোরাম। পাশাপাশি শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির পক্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদের সাথে আলোচনা করে এ বিষয়ে একটি সুষ্ঠু সমাধান বের করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। সূত্র : নয়াদিগন্ত