মুহাম্মদ আবদুল কাহহার (দিনাজপুর২৪.কম) অর্থনৈতিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তফসিলি ব্যাংক অন্যতম। মানুষের আশা ও ভরসার সেই স্থানটির নিরাপত্তা নিয়ে আজ আশঙ্কার শেষ নেই। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায় এ পর্যন্ত দেশে গত দেড় বছরে ৮টি ডাকাতির ঘটনাসহ অসংখ্য চুরির ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে গত ২১ এপ্রিল দিনের বেলা গ্রেনেড ও গুলি ছুড়ে আশুলিয়ার কাঠগড়া বাজারের কমার্স ব্যাংকে ডাকাতির সময় ৮ জন নিহত হওয়ায় সবাই বিস্মিত ! এছাড়া গত বছরের ২৬ জানুয়ারি কিশোরগঞ্জ শহরের রথখোলা এলাকায় সোনালী ব্যাংকের অফিসে সুড়ঙ্গের মাধ্যমে ডাকাতি শুরু হয়ে মার্চে বগুড়ার আদমদীঘির সোনালী ব্যাংক, ২৭ সেপ্টেম্বরে জয়পুরহাটের ব্র্যাক ব্যাংক, ৮ ডিসেম্বর মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে সোনালী ব্যাংকে ডাকাতির পাশাপাশি কমার্স ব্যাংকে ঘটে গেল লোমহর্ষক ঘটনা। ঝড়ে গেল তরতাজা ৮টি প্রাণ। এভাবে একের পর এক ব্যাংকে ডাকাতি ও চুরির ঘটনা ঘটছে। তারও আগে ২০০৮ সালের ৫ জানুয়ারি ধানমন্ডিতে ব্র্যাক ব্যংকের  একটি শাখায় ডাকাতির ঘটনা ঘটেছিল। এভাবে ব্যাংক গুলো দস্যুদের লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে।  সরকার কোন ভাবেই যেন ব্যাংক ডাকাতি রোধ করতে পারছেনা।

সাভারে এত বড় ধরেেণর হত্যাকা- ঘটে গেল অথচ পূর্ব থেকে গোয়েন্দা বিভাগ কোন ধরণের তথ্য উদঘাটন করতে পারলেন না।  ডাকাতির ঘটনার পর পরই কিছু কিছু মিডিয়া একটি আদর্শ ইসলামী ছাত্র সংগঠনের সদস্যদের জড়িত থাকার কথা অবলীলায় বলে গেলেন। এমনকি পুলিশের ঢাকা জোনের ডিআইজি মহোদয় সেই ছাত্র সংগঠনের জড়িত থাকার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার কথা সংবাদ সম্মেলন করে বললেন। অথচ পরে এই ডাকাতির সাথে জড়িত জঙ্গী সংগঠনের এক সদস্যকে পরিকল্পনার নকশাসহ গ্রেফতার করা হলো। মিডিয়ার সংবাদে জঙ্গী সংগঠনগুলোর সদস্যদের সম্পৃক্ততার বিষটি স্পষ্ট হয়েছে। এ থেকে সুস্পষ্ট বুঝা যায় কোন বিষয়ে সঠিক তদন্ত ছাড়া মনগড়াভাবে রাজনৈতিক চিন্তা থেকে ঢালাওভাবে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে অসত্যের আশ্রয় নেয়া ঠিক নয়। এই ঘটনার কয়েক দিন পরেই চট্টগ্রামের মুরাদপুরে আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক ডাকাতির চেষ্টা চালানো হয়। সেখানে অংশ নিয়েছিল চট্টগ্রাম যুবলীগের পাঁচ ক্যাডার। এ কারণে তারা ব্যাংকের নিরাপত্তারক্ষী ইব্রাহীমকে গলা কেটে হত্যা করেছিল। কথিত সেই সোনার ছেলেদের ছবিও মিডিয়াতে প্রকাশিত হয়েছে, কিন্তু প্রশাসনের পক্ষ থেকে এবার যে বক্তব্য এলো তাতে সেই অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় লুকানো হলো। এ ঘটনায় যাদেরকে গ্রেফতার করা হয়েছে কিংবা প্রকৃতভাবে যারা জড়িত তারা সবাই আইনের আওতায় আসবে কিনা, সঠিক বিচার হবে কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। বিভিন্নসময়ে  যারা  গ্রেফতার হয়, তাদের কেউ কেউ অপরাধী না হয়েও শুধু সন্দেহভাজন তালিকায় নাম থাকায় মাসের পর মাস কারাভোগ করছেন। আর কোন কোন ঘটনায় অপরাধীদের সনাক্ত করার পরিবর্তে পুলিশের তালিকা থেকে নাম বাদ দিতে মোটা অংকের বাণিজ্য হয়েছে বলেও জানা যায়। আবার কোথাও কোথাও  প্রকৃত অপরাধীরা দলীয় সুপারিশ নিয়ে জামিনে বেরিয়ে আসছে। প্রশ্ন হলো ডাকাতির ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে কোনো তদন্ত ছাড়াই নির্দোষ ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত করার অপচেষ্টা করা হয়, তখন প্রকৃত সত্যটি আড়াল হয়ে যায়। এভাবে করে ডাকাতির ঘটনাগুলো রাজনৈতিক চিন্তা থেকে আসামী সনাক্ত করায় প্রকৃত অপরাধীরা থেমে নেই। একের পর এক ব্যাংক ডাকাতি হচ্ছে কিন্তু স্বচ্ছতা ও জবাবদিহীতা না থাকার কারণে অপরাধীদেরকে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছেনা। আইনের সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হলে অপরাধ কমে যাওয়ার কথা, কিন্তু আমরা দেখছি কপরাধ কমছেনা বরং জ্যামিতিক হারে বেড়ে চলছে। এটাই যখন বাস্তবতা তখন আদর্শ রাষ্ট্র গঠনের ব্যর্থ চেষ্টা ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে।

বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে সিসি ক্যামেরা দেখা যায়। কিন্তু যখন কোন ঘটনা ঘটে, তখনই আমরা শুনে থাকি ঘটনার সময় সিসি ক্যামেরা বন্ধ ছিল বিধায় অপরাধীদেরকে সনাক্ত করা যাচ্ছে না। সিসি ক্যামেরা যদি সচলই না থাকে তাগলে সেটি সাটানোর তো কোন দরকার পড়ে না। আসামীদের আড়াল করতেই কি এই সাজানো বক্তব্য দেয়া হয় নাকি ভিন্ন কিছু সেটিও খতিয়ে দেখা উচিত। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে যদি একের পর এক চুরি, ডাকাতির ঘটনা ঘটে তাহলে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জায়গা কোথায় হবে ? গ্রাহকরা ব্যাংকের উপর আস্থা হারিয়ে ফেলবে, প্রবাসীরা অর্থ জমা করার জন্য বিকল্প পথ খুঁজে নেবে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে নতুন নতুন সমস্যার মোকাবেলা করতে হবে। তাই গ্রাহকের আস্থা অর্জনে প্রতিটি  ঘটনার সাথে যারা জড়িত তাদেরকে ন্যায় বিচারের মাধ্যমে শাস্তি দিতে হবে। তাছাড়া সাভারের ব্যাংক কর্মকর্তা নিহত হওয়ার পর থেকে সারাদেশের ব্যাংক কর্মকর্তারা নিরাপত্তহীনতায় ভুগছেন। উদ্বেগ- উৎকন্ঠায় দিন পার করছেন। বিশেষ করে নারী কর্মকর্তারা ভয়ের সাথে দায়িত্ব পালন করছেন। কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নেই বিধায কোন কোন কর্মকর্তা চাকরি ছেড়ে দেয়ার চিন্তা লালন করছেন।

একটি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যখন দুর্বল হয়ে পড়ে, শাসক শ্রেণি যখন শুধুই দলীয় সেবায় বিশ্বাসী, প্রশাসনই যখন ক্ষমতায় টিকে থাকার ভরসা, তখন সাধারণ মানুষের সেবায় আইনশৃঙ্খলাবাহিনীকে পাওয়া যায় না। শুধু দলীয় নেতাকর্মীদের নিরাপত্তার কাজে পুলিশকে ব্যবহার করার এ রীতি দীর্ঘদিনের। প্রশাসনে অধিক মাত্রায় দলীয়করণ হওয়ায় পুলিশকে রাষ্ট্রীয় কাজে খাটানোর পরিবর্তে ব্যক্তিগত ও দলীয় কাজে বেশি ব্যবহার করা হচ্ছে। যার ফলে পুলিশের নিয়মিত কাজেরও ক্ষতি হচ্ছে। এমনকি বড় অংকের টাকা বা ব্যাংকিং লেন-দেনের ক্ষেত্রে পুলিশের সাহায্য চাওয়া হলেও অনেক সময় তাদের পাওয়া যায় না। আবার কোথাও পুলিশের দেখা মিললেও পাওয়া যায় না তাদের সহায়তা। জনসম্পৃক্ততামূলক কর্মকা-ের চেয়ে সরকারদলীয় কর্মকান্ডেই তাদের বেশি সক্রিয় থাকতে দেখা যায়।

আশুলিয়ায় ডাকাতির সময় স্থানীয় মসজিদের মাইকে ডাকাতদের প্রতিরোধ করার আহবান জানানোর পরে স্থানীয়রা এগিয়ে আসে। তারপর আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যদের এগিয়ে আসার সংবাদ মিডিয়াতে প্রকাশিত হয়েছে। শুধু একটি ঘটনা নয়, প্রায় ঘটনাতে যথা সময়ে পুলিশের সেবা পাওয়া যায় না। পহেলা বৈশাখে টিএসসিতে নারী নির্যাতন, বই মেলা প্রাঙ্গনে ব্লগার  হত্যা, সুপ্রিমকোর্ট এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে লাঞ্চিতের ঘটনাসহ কোন প্রায় সব ক্ষেত্রেই দেখা যায় ঘটনা চলাকালে পুলিশ নিরব ভূমিকায় থাকে। কিন্তু, কেন ? সে বিষয়টি স্পষ্ট হওয়া উচিত। পুলিশ এসব ব্যাপারে কেন আগ্রহ প্রকাশ করেনা। অপরাধীকে সনাক্ত করা ও আটক করাতো পুলিশের দায়িত্ব। এসব ব্যাপারে তারা যে  দায়িত্বে অবহেলা করছে তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

ব্যাংকের নিরাপত্তা প্রদানের জন্য তিন ধাপে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বেশ কিছু নির্দেশনা দিয়েছে। কমার্স ব্যাংক আশুলিয়ার কাঠগড়া শাখায় প্রকাশ্য দুর্ধর্ষ ডাকাতির ঘটনায় শাখা ব্যবস্থাপক ও নিরাপত্তা প্রহরীসহ ৮ জন নিহত হওয়ায় ২২ এপ্রিল বাংলাদেশ ব্যাংক এর এক সার্কুলারে বলা হয়েছে, “ভবিষ্যতে এ ধরণের পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রতিটি ব্যাংক শাখাকে তাদের নিকটস্থ থানার সাথে একটি হটলাইনের মাধ্যমে দ্রুত যোগাযোগ স্থাপনের জন্য সংশ্লিষ্ট থানায় আবেদন করার জন্য পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এর আগে ১৭ নভেম্বর, ২০১৪ আরেকটি সার্কুলারে বলা হয়েছিল, ব্যাংক স্থাপনার অধিকতার নিশ্চিতকরণের নিমিত্তে ব্যাংক শাখার প্রবেশ পথে, শাখার অভ্যন্তরে এবং শাখার বাহিরের চর্তুদিকে নূন্যতম প্রয়োজনীয় সংখ্যক সিসিটিভি/ ইন্টারনেটভিত্তিক আইপি ক্যামেরা/ গোপনীয় বৈশিষ্ট্যের স্পাই ক্যামেরা ডিজিটাল ভিডিও রেকর্ডারসহ স্থাপন করার জন্য নির্দেশ প্রদান করেছিল। তারও আগে ২৭ জানুয়ারি, ২০১৪ আরেকটি সার্কুলারে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশ প্রদান করেছে যে, কাঠামোগত নিরাপত্তায় ব্যাংকের ভল্ট-স্পেস বিশেষভাবে সুরক্ষিত করার লক্ষ্যে ইস্পাতবেষ্টনী নির্মাণসহ ভল্টে সিকিউরিটি টেস্টেড দরজা স্থাপন করতে হবে। মেঝে ও ছাদসহ ভল্টের চারপাশের নির্মিত দেয়ালের নিরাপত্তা প্রদানের বিষয়টি পুরো প্রকৌশলী কর্তৃক প্রত্যায়িত হতে হবে। ভল্টের অভ্যন্তরে সিসিটিভি স্থাপনসহ ভল্টে সিকিউরিটি অ্যালার্মের সার্বক্ষণিক ব্যবস্থা রাখতে হবে। ভল্টের সিকিউরিটি সিস্টেমের সাথে ব্যাংকের সেন্ট্রাল ইনফরমেশেন সিস্টেমের নিরবিচ্ছিন্নভাবে সংযোগের ব্যবস্থা রাখতে হবে। সকল ভল্টের ভিতর অটোমেটেড ফায়ার এক্সটিংগুইশার স্থআপন থাকতে হবে। ভল্টে রক্ষিত সকল অর্থের পূর্ণ বীমা আচ্ছাদন নিশ্চিত করতে হবে।”

বাংলাদেশ ব্যাংক নিরাপত্তার স্বার্থে বার-বার তাগিদ দিলেও সেই নির্দেশনা যথাযথ মানা হচ্ছেনা। গণমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী প্রধান-প্রধান শহর ব্যতীত উপ-শহর কিংবা লোকালয়ের অনেক ব্যাংক এর শাখা প্রধানরা নানা অযুহাতে কালক্ষেপণ করছেন। বাংলাদেশ ব্যাংক তার দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করলেও মাঠ পর্যায়ে সে আদেশটি বাস্তবায়ন হতে বছর পেরিয়ে যায়। অনেক শাখায় ব্যাংকের ভল্টের নিরাপত্তা তেমন শক্তিশালী নয়। সিসি ক্যামেরা লাগানো নেই, এমনকি সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা প্রহরীর ব্যবস্থাও নেই। মানুষের অমানাত রক্ষার ব্যাপারে ব্যাংকগুলোর এই উদাসীনতা মোটেই গ্রহণযোগ্য  নয়।  শহর থেকে লোকালয় পর্যন্ত ব্যাংকের সব শাখাতে যাতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়, সে জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের নজরদারী বাড়ানো ও  কার্যকরী পদক্ষেপ সময়ের দাবী।

ডাকাতরা নিত্য নতুন কৌশল অবলম্বন করে ডাকাতি করে, তাই তাদেরকে সনাক্ত ও আটকের ক্ষেত্রেও নতুন-নতুন কৌশল অবলম্বন করা যেতে পারে। প্রত্যেকটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত না হওয়া, ডাকাতদের যথাযথ শাস্তি না দেয়া, বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রিতা এবং ব্যাংক ডাকাতির সাথে প্রহরীদের জড়িত থাকার বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা উচিত। ডাকাতী ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের সাথে যারা জড়িত তাদেরকে বিন্দু মাত্র ছাড় দেয়া হলে অপরাধ কমবেনা বরং বাড়বে। আমরা জানিনা এর শেষ কোথায় তবে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি রোধকল্পে  জাতীয় স্বার্থে সরকারের পাশাপাশি প্রত্যেকের অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা উচিত।

লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট

mabdulkahhar@gmail.com