(দিনাজপুর২৪.কম) ‘আমি আকুতি মিনতি করি। আল্লাহর কসম দেই। সন্তানের কসম দেই। প্রাণভিক্ষা চাই, তাদের কাছে। এরপরও তারা ক্ষান্ত হচ্ছিলেন না। তারা আমাকে বারবার কলেমা পড়তে বলছিলেন। এ সময় আরডিসি অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে।’ অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে এনকাউন্টার করা হবে বলে জানানো হলে এমন আকুতির কথা জানিয়েছিলেন সাংবাদিক আরিফুল। পরে তাকে হাত ও চোখ বাঁধা অবস্থায় জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের একটি কক্ষে নিয়ে বিবস্ত্র করে অমানুষিক নির্যাতনসহ তার ভিডিও ধারণ করা হয়।

আরিফুল ইসলাম জানান, চোখ বাঁধা অবস্থায় তার কাছ থেকে জোর করে ৪টি কাগজে স্বাক্ষর নেয়া হয়। পরে

তাড়াহুড়ো করে আমাকে কারাগারে পাঠানো হয়। আমাকে যে নির্যাতন করা হয়েছে তার আঘাতের চিহ্ন আমার শরীরে আছে।
জামিনের আবেদন করেছেন কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, আমি হাসপাতালে আসার পূর্ব পর্যন্ত যা কিছু হয়েছে তা আমার অসম্মতিতে হয়েছে। আমাকে ফোর্স করে করানো হয়েছে। কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের বেডে থাকা অবস্থায় সাংবাদিকদের এসব কথা জানান আরিফুল ইসলাম রিগান। বর্তমানে তিনি চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে রয়েছেন। কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার রেদওয়ান ফেরদৌস সজীব জানান, আরিফুল ইসলাম রিগান বর্তমানে ভালো আছে। তার শারীরিক বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। এসব রিপোর্ট হাতে আসলে প্রকৃত অবস্থা জানা যাবে।
এদিকে রোববার সকালে রিগানের জামিন নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। কীভাবে তার জামিন হলো এ নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান পরিবারের সদস্যরা। জামিনের কথা শুনে কুড়িগ্রাম প্রেস ক্লাবে পূর্ব নির্ধারিত মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি ফেলে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে ছুটে যান সাংবাদিকরা। সেখানে গিয়ে জানতে পারেন সকাল সাড়ে ১০টায় সাংবাদিক আরিফুলের জামিন হয়েছে।
এ ব্যাপারে আরিফুলের পক্ষে নিয়োজিত আইনজীবী এডভোকেট শাখাওয়াত হোসেন সাংবাদিকদের জানান, আরিফুলের সম্মতিতে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে তিনি জামিনের জন্য আবেদন করেন। তার জামিন আপিল অনুমোদনের পর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সুজাউদ্দৌলার আদালতে জামিন আবেদনের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানিতে রাষ্ট্র পক্ষে ছিলেন এডভোকেট এসএম আব্রাহাম লিংকন এবং আরিফুলের পক্ষে ছিলেন এডভোকেট শাখাওয়াত হোসেন ও এডভোকেট আহসান হাবীব নীলু। আপিল শুনানি শেষে ২৫ হাজার টাকার বন্ডে স্থানীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি এডভোকেট আহসান হাবীব নীলু’র জিম্মায় আরিফুলকে জামিন দেয়া হয় বলে জানা যায়।
এর আগে শুক্রবার মধ্যরাতে ফিল্মি কায়দায় আরিফুলকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে বেধড়ক পেটাতে পেটাতে ও বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে জেলা প্রশাসক অফিসে নেয়া হয়। সেখানে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে এক বছর বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরো ১৫ দিনের জেল দেয়া হয়।
উল্লেখ্য, সকাল সাড়ে ১০টায় জামিন শুনানির পর দুপুর ১২টায় কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্ত হন সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম রিগান।
জামিনের বিরোধিতা করে রিগানের বোন রিমা জানান, আমরা কোনো কাগজে স্বাক্ষর করিনি, আপিলও করিনি। আমরা সম্পূর্ণ বিষয়টি তার অফিসের ওপর ছেড়ে দিয়েছি। অফিসের লোকজনের পরামর্শে আমাদের আপিল করার কথা ছিল। একই কথা জানালেন রিগানের মামা নবিদুল। তিনি জানান, আমরা ডিসি অফিসে এসেছি নথিপত্র তোলার জন্য। কিন্তু এসে জানতে পারলাম তাকে জামিন দেয়া হয়েছে। কে বা কারা করেছে আমাদের জানা নেই। পরিবারের পক্ষ থেকে জামিন চাওয়া হয়নি।
এদিকে বাংলা ট্রিবিউনের ঢাকা ন্যাশনাল ডেক্স ইনচার্জ শাহ আলম সাংবাদিকদের জানান, যতটুকু জেনিছি তাকে আরডিসি অফিসে ন্যাংটা করে টর্চার করা হয়েছে। এখন টর্চার করে যদি জামিন নেয়া হয়ে থাকে আমরা সম্পূর্ণরূপে এর বিরোধিতা করছি। অর্থাৎ এটা আমরা অফিসিয়ালি ব্যবস্থা নেবো কি করা যায়।
চলমান এ ঘটনায় জনপ্রশাসন বিভাগের সচিব শেখ ইউসুফ হারুন কুড়িগ্রামে কর্মরত সাংবাদিকদের ধৈর্য ধারণের অনুরোধ জানিয়ে দুপুর ২টায় মোবাইলে জানান, তদন্ত প্রতিবেদন পেলে সেটি পর্যালোচনা করে আইনানুগ কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। সরকার কোনো অন্যায়ের পক্ষে থাকবে না।
এদিকে সাংবাদিক আরিফুলের ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদে কুড়িগ্রাম শহর ও বিভিন্ন উপজেলায় মানববন্ধন ও প্রতিবাদের খবর পাওয়া গেছে।
কুড়িগ্রামের ডিসিকে প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত
সাংবাদিক আরিফুল ইসলামকে মধ্যরাতে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে কারাদণ্ড দেয়ার ঘটনায় কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোছা. সুলতানা পারভীনকে প্রত্যাহার করা হচ্ছে। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থাও নেয়া হবে। গতকাল সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের এসব কথা জানান জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন। প্রতিমন্ত্রী বলেন, এই ঘটনায় রংপুরের বিভাগীয় কমিশনারকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। সেখানে অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার তদন্ত করেন। ইতিমধ্যে তদন্তের খসড়া প্রতিবেদন পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তার সঙ্গেও কথা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, এই ঘটনায় বেশ কিছু অনিয়ম হয়েছে। এ জন্য এখন তার (ডিসি) বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। তদন্তের ভিত্তিতে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে। কুড়িগ্রামের ডিসিকে প্রত্যাহারে বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী বলেন, সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রক্রিয়াটি চূড়ান্ত করা হচ্ছে।
আরিফুল অনলাইন গণমাধ্যম বাংলা ট্রিবিউনের জেলা প্রতিনিধি। তাকে শুক্রবার মধ্যরাতে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়, মাদকবিরোধী অভিযানে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার কাছ থেকে ৪৫০ গ্রাম দেশি মদ ও ১০০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধার করা হয়। রাতের বেলা এভাবে সাংবাদিককে বাড়ি থেকে তুলে এনে ভ্রাম্যমাণ আদালতে সাজা দেয়ার ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ এতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান। সাংবাদিক আরিফুলকে গতকাল জামিন দিয়েছেন কুড়িগ্রামের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. সুজাউদ্দৌলা। তবে এই জামিন চেয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো আবেদন করা হয়নি বা তিনি কোনো আইনজীবীও নিয়োগ দেননি বলে নিশ্চিত করেছেন আরিফুলের স্ত্রী মোস্তারিমা সরদার। -সূত্র : মানব জমিন