-সংগ্রহীত

(দিনাজপুর২৪.কম) আমার একমাত্র মেয়ে নুসরাত। সেদিন সে পরীক্ষা দিতে গিয়েছিল, আর তার সাথে এমন ঘটনা ঘটেছে। আমার ভিতরে কি চলছে তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না। মেয়ে হারানোর বেদনায় কলিজায় দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। আমি এর ন্যায়বিচার চাই।

আজ বৃহস্পতিবার ঢাকা মেডিকেল কলেজে হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের সামনে এভাবেই কথাগুলো বলেন দুর্বৃত্তের আগুনে দগ্ধ ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফির বাবা কে এম মুসা।

কে এম মুসা বলেন, আমি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। সকলেই আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। আপনাদের সবার কারণে আমার মেয়ের এই পরিণতির কথা সবাই জানতে পেরেছে।

এই কথাগুলো বলতে গিয়ে কান্নায় বার বার বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ছিলেন কে এম মুসা। পরে তিনি নিজেকে সামলিয়ে আবারো বলেন, সেই দিন আমার মেয়ে পরীক্ষা দিতে গিয়েছিল, কিন্তু সেই দিনই আমার একমাত্র মেয়ের সাথে এ ঘটনা ঘটেছে। আমি ভাষা হারিয়ে ফেলেছি, কি বলব জানি না। আমাদের ভিতরে যে কি চলছে তা আমি বুঝাতে পারছি না। আমার কলিজায় দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে।

দোষীদের বিচারের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ইতমধ্যেই আমরা মেয়ের বিষয়ে সকল কিছুই প্রকাশিত হয়েছে। আমার দাবি দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী সুষ্ঠু ও ন্যায়বিচার যেন হয় দায়ীদের।

এর আগে আজ সকাল ৯টায় নুসরাতের লাশ মর্গে নেয়া হয় ময়নাতদন্তের জন্য। এছাড়া ইতোমধ্যে নুসরাতের সুরতহাল প্রতিবেদন সম্পন্ন করেছে শাহবাগ থানা পুলিশ।

এ বিষয়ে শাহবাগ থানার এসআই শামছুর রহমান বলেন, আমরা সুরতহাল শেষ করে ফেলেছি। এখন শুধু অপেক্ষা ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের। এই প্রতিবেদন পেলেই আমরা লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে দিব।

শ্লীলতাহানির মামলা তুলে না নেয়ায় ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা তার অনুসারীদের দিয়ে গত ২৭ মার্চ নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা চালান বলে মেয়েটির স্বজনদের অভিযোগ।

হাসপাতালে নেয়ার সময় অ্যাম্বুলেন্সে নুসরাত তার ভাইকে জানায়, তার বান্ধবী নিশাতকে মারধর করা হচ্ছে বলে পরীক্ষার হল থেকে তাকে ডেকে তৎসংলগ্ন সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে নেয়া হয়। এ ভবনের দ্বিতীয় তলায় আলিম শ্রেণিকক্ষ ও অধ্যক্ষের কার্যালয়। সেখানে আগ থেকে বোরকা পরা চার ব্যক্তি ওঁৎ পেতে ছিল। তারা তাকে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে দেয়া অভিযোগ প্রত্যাহার করার জন্য চাপ প্রয়োগ করে। নুসরাত এটা করতে অস্বীকার করে। তার ভাষ্য মতে, ‘আমি যা বলেছি সত্য বলেছি। মৃত্যু পর্যন্ত এ অন্যায়ের প্রতিবাদ করে যাব। শিক্ষক হয়ে তিনি কিভাবে গায়ে হাত দিলেন…। এ সময় তিনজন হাত ধরে আরেকজন কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়।’ এতে চিৎকার দিয়ে নুসরাত সিঁড়ি বেয়ে নিচের দিকে দৌড় দেয়। হামলাকারীদের একজনের কণ্ঠ তার চেনা বলে সে দাবি করে। তাহলে পরীক্ষার হল থেকে ডেকে নেয়া ওই শিক্ষার্থী এবং ঘটনায় জড়িত চারজন কারা- এ নিয়ে প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। পরীক্ষা শুরু হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে সংরক্ষিত পরীক্ষাকেন্দ্রে কিভাবে এমন জঘন্য ঘটনা ঘটল এ নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে দায়িত্বরত কেউ হামলাকারীদের আসা-যাওয়ার সময় দেখেননি বলে তদন্তকারী কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন।

দায়িত্বরত একটি সূত্রের দাবি, ওই ছাত্রী পরীক্ষার হল থেকে নিজেই বেরিয়ে ছাদে যায় এবং কেরোসিন ঢেলে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। চিৎকার শুনে তারা এগিয়ে এসে তাকে উদ্ধার করে। এ সময় ছাদ থেকে কেরোসিন বহনকারী পলিথিন, দিয়াশলাই কাঠি ও আগুনে পোড়া বোরখার টুকরো উদ্ধার করা হলেও হামলাকারীদের কাউকে দেখা যায়নি।

তবে মাদরাসার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের কয়েকজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, নুসরাতকে আগুন লাগিয়েই হামলাকারীরা দক্ষিণ দিকে দ্রুত পালিয়ে যায়। অনেকে দেখলেও প্রাণভয়ে তা গোপন রাখছেন। ওই সূত্র আরো জানায়, ঘটনার দিন সকাল ৮টার দিকে মাদরাসার প্রভাষক মো: আফছার উদ্দিন মোবাইল ফোনে নুসরাতের ভাই আবদুল্লাহ আল নোমানকে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে দেয়া মামলা সম্পর্কে জানতে চান। মামলাটি সমঝোতা করার জন্য তিনি নোমানকে তাগিদ দেন। এ ছাড়া মাদরাসা শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি শাহাদাত হোসেন শামীম অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাটি প্রত্যাহারের জন্য নুসরাতের পরিবারকে অব্যাহতভাবে হুমকি-ধমকি দেয় বলে জানায় নোমান।

স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র জানায়, মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা তার প্রভাব ধরে রাখতে একদিকে সরকারদলীয় কিছু নেতার সাথে গভীর সখ্য বজায় রাখেন এবং অন্য দিকে মাদরাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একটি অংশকেও নানা সুবিধা দিয়ে লালন করেন। ২৭ মার্চ নিজ কক্ষে ডেকে নিয়ে যৌন হয়রানির অভিযোগে নুসরাতের মায়ের করা মামলায় ওইদিনই গ্রেফতার হন অধ্যক্ষ। ঘটনার পর তার শাস্তি ও মুক্তির দাবিতে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি পালন হয়ে আসছে।

এদিকে এ ঘটনায় গত রোববার থেকে আগামী ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত মাদরাসার স্বাভাবিক কার্যক্রম ও অনির্দিষ্টকালের জন্য হোস্টেল বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। -ডেস্ক