(দিনাজপুর২৪.কম) ফুটবলে আমূল পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়ে মাঠ চষে বেড়িয়েছেন। যখন নির্বাচন করে ফুটবলের চেহারা বদলে দেয়ার সুযোগ পেলেন, তখন নির্বাচনের মাঠ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন তরফদার মোহাম্মদ রুহুল আমিন। বাদল রায় সভাপতি পদে মনোনয়ন ফরম জমা দিয়ে আবার প্রত্যাহার করারও আবেদন করেছিলেন। কিন্তু প্রত্যাহারের সময় পার হওয়াতে ব্যালটে নাম থাকছে তার। ব্যালটে নাম থাকলেও শেষ পর্যন্ত তিনি লড়াইয়ে আছেন কি না বোঝা যাচ্ছে না। শফিকুল ইসলাম মানিককে সভাপতি প্রার্থী হিসেবে খুব একটা আমলে নিচ্ছেন না কাউন্সিলররা। তাইতো লড়াইয়ের আগে প্রতিদ্বন্দ্বীদের দোটানায় টানা চতুর্থবারের মতো বাফুফে সভাপতি হওয়ার পথে কাজী মোহাম্মদ সালাউদ্দিন!
এই ২০০৮ সালে তিনি ফুটবলের নির্বাচনী খেলায় মেতেছিলেন একদম আনকোরা প্রার্থী হয়ে। মাঠের ফুটবল তার জন্য যত সহজ ছিল, তার চেয়ে ঢের কঠিন ছিল এই ভোটের খেলা।

তখন কোনো পর্যায়ে নির্বাচনের কোনো অভিজ্ঞতাই তার ছিল না। দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন ফুটবলের বাইরে। তা ছাড়া সময়টাও ছিল অনেকখানি সেনাশাসনের মতো, আবার লড়াই করতে হবে মেজর জেনারেল (অব.) আমিন আহমেদ চৌধুরীর সঙ্গে। তার সঙ্গে ছিলেন বেশকিছু সাবেক ফুটবল তারকাও। এ রকম মোর্চার বিরুদ্ধে সভাপতি পদে প্রয়াত মেজর জেনারেলকে হারিয়ে সালাউদ্দিন দায়িত্ব নিয়েছিলেন দেশের ফুটবলের। সেই থেকে মাঠের তারকার সংগঠক হয়ে ওঠা এবং ফুটবলের নতুন সাংগঠনিক যাত্রা শুরু। প্রথম মেয়াদটা তাঁর দুর্দান্তই কেটেছে। অনিয়মিত ফুটবল লীগের নিয়মিতকরণ ও কিছু ফুটবলীয় সংস্কারে চার বছর ছিল আশা-জাগানিয়া। সেই মেয়াদ পার করে আবার ভোটের খেলায় তিনি অক্ষুণ্ন রাখেন সভাপতি পদের শিরোপা। আরেক সংগঠক আব্দুর রহিম শুরুতে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেও শেষ পর্যন্ত ভোটের আগেই আত্মসমর্পণ করেন তার কাছে। সেই মেয়াদ শেষে ২০১৬ সালে হঠাৎ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে ফুটবলাঙ্গন! এক পক্ষ গেল গেল রব তোলে আর ব্যর্থতার জন্য আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেয় কিংবদন্তিকে। খুব অস্বস্তিকর পরিবেশ ছিল তার জন্য, কিন্তু প্রতিপক্ষ অজানা-অচেনা কামরুল ইসলাম পোটন। শেষ পর্যন্ত ৮৩ জন ভোটারের রায়ে সালাউদ্দিন রক্ষা পান এবং স্বপদে বহাল থাকেন। চার বছর আগের সেই নির্বাচনে সালাউদ্দিনের প্যানেলের প্রধান সমন্বয়কারী ছিলেন তরফদার মোহাম্মদ রুহুল আমিন। নিজে নির্বাচন না করে আমিন হয়েছিলেন নেপথ্য কারিগর। সুবাদে কিছু নির্বাচনী শিক্ষা তাঁর হয়েছিল বৈকি। সেটুকুর সঙ্গে গত চার বছরের কিছু ফুটবলীয় কর্মকাণ্ডকে পুঁজি করে তিনি এবার সালাউদ্দিনের চ্যালেঞ্জার হতে চেয়েছিলেন। নিজের পক্ষে হাওয়াও গরম করেছিলেন, কিন্তু সেটা আর গরম থাকেনি শেষমেশ। কয়েক মাস আগে হঠাৎ করে ব্যবসাপাতি নিয়ে টান দিলে সভাপতি পদে নির্বাচন না করার ঘোষণা দিয়ে এই অঙ্গন ছাড়েন! সভাপতি পদে বাদল রায় মনোনয়ন কিনলেও অদৃশ্য এক চাপে তিনিও নির্বাচনী মাঠে নেই। শফিকুল ইসলাম মানিক থাকলেও তাকে নিয়ে নানা গুঞ্জন চারিদিকে। কাউন্সিলরদের সঙ্গে কথা বলেও বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কাউন্সিলর জানিয়েছেন নির্বাচনকে অর্থবহ করতেই মানিককে নির্বাচনে দাঁড় করিয়েছেন সালাউদ্দিন! নইলে কাউকে কিছু না জানিয়ে ডেলিগেটদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা না করেই তিনি কীভাবে সভাপতি পদে প্রার্থী হলেন? জেলা ও বিভাগীয় সংগঠক পরিষদের মহাসচিব আশিকুর রহমান মিকুও সভাপতি পদ নিয়ে কোনো কথা বলতে চাইছেন না। সভাপতি পদ নিয়ে কথা না বললেও অন্যসব পদে তুমুল লড়াইয়ের ইঙ্গিত দিয়েছেন এই ক্রীড়া সংগঠক।

সালাম না আসলাম
বাফুফের গত নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সিনিয়র সহ-সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন আব্দুস সালাম মুশের্দী। সালামকে চ্যালেঞ্জ জানাতে গত তিন মেয়াদে বাফুফের সদস্য পদে থাকা শেখ মোহাম্মদ আসলাম এবার সিনিয়র সহ-সভাপতি প্রার্থী। নির্বাচনে জয়ের আশা ব্যক্ত করে আসলাম জানান, গত ১২ বছর এই পদে ছিলেন তিনি। দীর্ঘ সময় দেশের ফুটবল উন্নয়নে তিনি কী ভূমিকা রেখেছেন তা সকলের জানা। তাই আমি মনে করি কাউন্সিলররা ব্যালটের মাধ্যমেই আজ তাকে জবাব দিবেন। এদিকে আব্দুস সালাম মুর্শেদী বলেন, কাজ করলে সমালোচনা হবে। আমার কাজ করেছি বলেই সমালোচনা হচ্ছে। আমার বিশ্বাস কাউন্সিলর আমাদের কর্মের মূল্যায়ন করেই আমদের পক্ষে রায় দিবেন। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী আসলামকে উদ্দেশ্য করে সালাম মুর্শেদী বলেন, তিনি তো বাফুফের নির্বাহী কমিটিতে আমার সহকর্মী হিসেবে ছিলেন। কই কখনো সভাতে কোনো কিছুর প্রতিবাদ করতে দেখেনি। যতি আমাদের কাজ এতোই খারাপ হতো তবে পদত্যাগ করে প্রতিবাদ করেননি কেন। সকল সুযোগ-সুবিধা নিয়ে এখন নির্বাচনের সময় এসব বলে লাভ নেই। কাউন্সিলররা সব বোঝো।

আলোচনায় তাবিথ আউয়াল
২০১২ সালে প্রথমবারের মতো বাফুফের সহ-সভাপতি পদে নির্বাচনে দাঁড়ান তাবিথ আউয়াল। তখন তাকে অনেকেই পরামর্শ দিয়েছিলেন এই পদে নির্বাচন না করে সদস্য পদে দাঁড়াতে। কিন্তু তাবিথ সহ-সভাপতি পদে নির্বাচন করেই পাস করেন। ছিলেন কাজী সালাউদ্দিনের বিরোধী প্যানেলে। ২০১৬ সালে তাবিথকে রাখেনি কোনো প্যানেল। ফলে তার একাকী সংগ্রাম। দুই প্যানেলের বাঘা বাঘা প্রার্থীকে টপকে পাস করা। নানা যড়যন্ত্রও ঠেকাতে পারেনি তাকে। এবারো তাবিথ আউয়াল কোনো প্যানেলে নেই। নির্বাচন করছেন স্বতন্ত্র হিসেবে। এবারো তিনি পাস করবেন, এমন আত্মবিশ্বাসের কথা জোর দিয়েই উল্লেখ করেন তিনি। তিনি জানান, আমার পুরো আত্মবিশ্বাস আছে নির্বাচনে জেতার। ২০১২ সালে ৭০ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় সহ-সভাপতি হন তিনি। পরের বার ৬৬ ভোট পেয়ে হন চার সভাপতির মধ্যে চতুর্থ।
বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের দুই গুরুত্বপূর্ণ পদে তিনি। ন্যাশনাল টিমস ম্যানেজমেন্ট কমিটির ডেপুটি চেয়ারম্যান তিনি। একই সঙ্গে টেকনিক্যাল কমিটির চেয়ারম্যান। বাফুফেকে আর্থিকভাবে সহায়তা করেছেন। সরকার বিরোধী রাজনীতি করার কারণে এবার তাবিথ আউয়ালকে হারাতে উঠে পড়ে লেগেছে একটি পক্ষ। তবে তাবিথের বিশ্বাস সকল ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে কাউন্সিলররা তার কর্মের মূল্যায়ন করবেন।

বির্তকে আমিরুল ইসলাম বাবু
বাফুফের গত তিনটি নির্বাচনে সদস্য পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন আমিরুল ইসলাম বাবু। এবার কাজী সালাউদ্দিনের ইচ্ছায় তিনি সহ-সভাপতি প্রার্থী হয়েছেন। সালাউদ্দিনের বাবুপ্রীতি অস্বস্তিতে ফেলেছে তার নেতৃত্বাধীন পরিষদের অনেককেই। মন থেকেই যেন বাবুকে সহ-সভাপতি পদে মানতে পারছেন না তারা। আবার প্যানেল প্রধানের চাওয়া উপেক্ষাও করতে পারছেন না। গুঞ্জন আছে, প্যানেল চূড়ান্ত করার আগে বাবুকে সহ-সভাপতি করা নিয়ে জোর আপত্তি ছিল দুই সহ-সভাপতির। কিন্তু সালাউদ্দিন নিজের সিদ্ধান্তে অনড়। তার চোখে বাবু একজন দক্ষ ভোটশিকারি। ফুটবলেও আলোচিত মুখ বাবু। দীর্ঘদিন মোহামেডানের ম্যানেজার পদটি দখল করে ছিলেন এই ব্যক্তি। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিজেও ভোল পাল্টে প্রায় দেড় দশক মোহামেডানের ফুটবল ছিল তার জিম্মায়। বছরের পর বছর নিম্নমানের দল গড়ে মোহামেডানকে পরিণত করেছেন মাঝারি মানের দলে। অভিযোগ আছে, ফুটবলারদের সঙ্গে গোপন চুক্তি করে অনেক টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বাবু। জানা গেছে, মোহামেডানের বর্তমান ফুটবল কমিটির হাতে রয়েছে তার বিরুদ্ধে ফুটবলারদের সাক্ষ্যসহ অনেক প্রমাণ। কমিটির এক শীর্ষ কর্তা এই নির্বাচনে বাবুর বিরুদ্ধে প্রমাণপত্র নিয়ে মাঠে নামারও হুমকি দিয়েছেন। তার পরেও নির্বাচনে আছেন বাবু! -ডেস্ক