মোঃ আফজাল হোসেন (দিনাজপুর২৪.কম) আজ ৪ ডিসেম্বর সোমবার দিনাজপুর জেলার ফুলবাড়ী মুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের ৪ ডিসেম্বর শুক্রবার মুক্তিযোদ্ধারা পাক বাহিনীর সাথে প্রাণপণ লড়াই করে পাকিস্তানী পাক হানাদার বাহিনীকে দিনাজপুরের ফুলবাড়ী থেকে বিতাড়িত করে ফুলবাড়ী এলাকা হানাদার শত্রুমুক্ত করে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। দেশ মাতৃকাকে রক্ষার দৃঢ় প্রত্যয়ে এ দেশের দামাল ছেলেরা নিজের জীবনকে বাজি রেখে পাকিস্তানী পাক হানাদার বাহিনীকে মুক্ত করা সেই সব বীর সেনানী মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে ১৯৭১ সালের মার্চ মাস থেকে যখন পাকিস্তানী পশ্চিমা শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সারা দেশ ব্যাপি উত্তাল আন্দোলন চলছিল তখন দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং বাঙ্গালী ও অবাঙ্গালীদের মধ্যে যাতে করে কোন সংঘাত সৃষ্টি না হয় সে জন্য মার্চের প্রথম সপ্তাহে দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে গঠিত হয় সর্ব দলীয় শক্তিশালী সংগ্রাম কমিটি। ২৪ মার্চ পর্যন্ত দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে পূর্ণ শান্তি বিরাজ করে। এমনি এক মুহুর্তে ২৫ মার্চ গভীর রাতে ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, রংপুর ও বগুড়ার বিভিন্ন এলাকায় পাকিস্তানী পাক বাহিনী হানা দিয়ে হত্যা করে অসংখ্য নিরীহ বাঙ্গালীকে। পরের দিন ২৬ মার্চ এই হত্যাযজ্ঞের খবর বিভিন্ন এলাকা থেকে রেডিও টিভিতে জানতে পেরে ফুলবাড়ীতে বাঙ্গালীদের মধ্যে চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। এই হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদে ঐ দিন সকাল থেকে সর্ব দলীয় সংগ্রাম কমিটির উদ্যোগে ফুলবাড়ী শহরে বের করা হয় এক বিশাল প্রতিবাদ মিছিল। মিছিলটি শান্তিপূর্ণ ভাবে দিনাজপুরের ফুলবাড়ী রেলষ্টেশন থেকে কাঁটাবাড়ী বিহারীপট্টি হয়ে বাজারে ফেরার পথে বিহারীপট্টিতে মিছিলকে লক্ষ্য করে কে বা কাহারা গুলি ছুরলে সংঘাতের সূত্রপাত ঘটে। শুরু হয় বিহারীদের বাড়িতে ব্যাপক অগ্নিসংযোগ ও লুটতারাজ এ সময় ফুরবাড়ীর মুক্তিকামী মানুষ বিহারীপট্টির অবাঙ্গালী বিশিষ্ট ব্যক্তি ডাঃ শওকতের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করে। এতে ডাঃ শওকতসহ তার পরিবারের ৫জন সদস্য অগ্নিদগ্ধ হয়ে নির্মম ভাবে নিহত হন। তার ভাইকে উদ্ধার করে ফুলবাড়ী হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হলে সেখানে কতিপয় ব্যক্তি ইট ও পাথর ছুড়ে মেরে হত্যা করে। এপ্রিলের ২ তারিখ পাক হানাদার বাহিনী ফুলবাড়ী আক্রমন শুরু করে পুরো ফুলবাড়ীকে নিয়ন্ত্রণ করে নেয়। এরপর থেকে শুরু হয় বাঙ্গালীদের উপর দখলদার বাহিনীর নির্মম অত্যাচার হত্যা লুটতারাজ ও অগ্নিসংযোগসহ নানা নির্যাতন। দিনাজপুরের ফুলবাড়ীর মুক্তিকামী আবাল বৃদ্ধ যুবকেরা এবং নারীরাও মাতৃভূমিকে দখলদার মুক্ত করতে সকলে যোগ দেয় ভারতে গিয়ে মুক্তিবাহিনীতে। দীর্ঘ ৯ মাস পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে পরবর্তীতে পরিকল্পনা অনুযায়ী ফুলবাড়ীকে পাকহানাদার মুক্ত করার জন্য ১৯৭১ সালের ৪ ডিসেম্বর রোজ শুক্রবার মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সেনাবাহিনী যৌথ ভাবে দিনাজপুরের ফুলবাড়ী থানার বেতদিঘী, কাজিয়াল, এলুয়াড়ী এবং জলপাইতলী, পানিকাটা, রুদ্রানী, আমড়া ও রানিনগর এলাকার বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা দিয়ে প্রবেশ করে পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে চর্তুমুখী আক্রমন শুরু হয়। এ সময় মিত্র বাহিনীর হাতে নিশ্চিত পাক হানাদার বাহিনী পরাজয় বুঝে দখলদারেরা মিত্র বাহিনীর ফুলবাড়ী শহরে আগমন রোধ করতে ঐ দিন বিকেল সাড়ে ৩টায় ফুলবাড়ীর পশ্চিম পার্শ্বে ছোট যমুনার উপর লোহার ব্রীজটির পূর্বাংশ শক্তিশালী ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দেন। ব্রীজটি ধ্বংস অংশ প্রায় ২ থেকে ৩ মাইল দূরে গিয়ে ছিটকে পড়ে। এই ব্রীজটি বর্তমান প্রজন্মের জন্য কালের স্বাক্ষী হয়ে দাড়িয়ে আছে যমুনা নদীর বুকে। এদিকে মিত্র বাহিনী ফুলবাড়ী শহরে প্রবেশ করতে না পারে এ জন্য পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী এই ব্রীজটি ধ্বংসের উদ্দেশ্য ছিল তাদের। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অবাঙ্গালীরা বিশেষ ট্রেন যোগে ফুলবাড়ী থেকে সৈয়দপুর চলে যান। ট্রেনটি ধ্বংশের জন্য মুক্তিযোদ্ধারা কয়েকটি মটার ও সেল নিক্ষেপ করলে তা ব্যর্থ হয়ে যায়। ফলে ট্রেনটি বেঁচে যায় এবং সৈয়দপুরে গিয়ে পৌঁছে। মুক্তিযোদ্ধাদেরকে ঐ সময় দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল ২০ নম্বর ব্রীজটি উড়িয়ে দেয়ার জন্য। কিন্তু নানা কারণে সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। ফুলবাড়ী স্বাধীন হওয়া মাত্র ৭ই ডিসেম্বর ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাজোয়াযান যমুনা নদী পার হয়ে চকচকা রাইস মিলের নিচ দিয়ে উপরে রাস্তায় এসে দাঁড়ালে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর পুতে রাখা মাইন বিস্ফোরনে গাড়ীটি চুরমার হয়ে যায়। সাজোয়াযানে থাকা একজন ভারতীয় সেনা বাহিনীর অফিসারসহ ৩ জন নিহত হয়। যা ইতিহাসের স্বাক্ষী হয়ে যমুনা নদীর তীরে সরকারী কলেজ সংলগ্ন স্থানে সেই শহীদের সমাধি দেয়া হয় এবং সেখানে তাদের স্মরণে একটি স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করা হয়।