(দিনাজপুর২৪.কম) কক্সবাজারের উখিয়া এবং টেকনাফের দুটি ক্যাম্পে সরকারি হিসাবে পার্শ্ববর্তী মিয়ানমার থেকে অবৈধভাবে প্রবেশ করে শরণার্থী মাত্র ৩২ হাজার। এই সংখ্যা কাগজে-কলমে রেখে সরেজমিন ক্যাম্পে ঢুকলেই সরকারি হিসাবের সঙ্গে বাস্তবতার গরমিল চোখে পড়বে। ক্যাম্পে বসবাসকারীরাই দাবি করেছে, লাখ খানেক মানুষ এই ছোট্ট জায়গায় কষ্ট করে দিন যাপন করছে বছরের পর পর। বেসরকারি সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সরকারি দুটি ক্যাম্পে প্রায় দুই লাখ শরণার্থী সরকারি হিসাবের বাইরে বসবাস করছে। ক্যাম্পের বাইরে কক্সবাজার জেলার একাধিক উপজেলায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসবাস রয়েছে আরও প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গা। সরকারের নানা তৎপরতা, দেন-দরবার আর কঠোর ব্যবস্থার ঘোষণার মধ্যেই এ অঞ্চলে দিন দিন বাড়ছে অবৈধ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সংখ্যা। চার লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়ালেও ২৪ বছর ধরে কাগজে-কলমের সেই ৩২ হাজার রোহিঙ্গার প্রত্যাবাসন নিয়েই মিয়ানমারের সঙ্গে চলছে দেন-দরবার। মিয়ানমারের অসহযোগিতার কারণে ২০০৫ সালের জুলাই থেকে বন্ধ রয়েছে রোহিঙ্গা শরণার্থী প্রত্যাবাসন।

এদিকে সরেজমিন গিয়ে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র থেকে জানা যায়, রোহিঙ্গারা এখন কক্সবাজারের বাইরেও অবাধে বিচরণ করছে। জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণসহ একাধিক আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে গোপন তৎপরতা চালানোর অভিযোগ রয়েছে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে। স্থানীয় একাধিক প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তির সহায়তায় মিথ্যা তথ্য দিয়ে তারা বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্র এবং পাসপোর্টও পাচ্ছে। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক আলী হোসেন দিনাজপুর২৪.কমকে বলেন, রোহিঙ্গারা এখন অভিশাপ। তারা এখানে অবৈধ বসতি গড়ে আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটাচ্ছে। শরণার্থী ক্যাম্পে বসে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত হচ্ছে। রোহিঙ্গাদের দ্বারা সংঘটিত হচ্ছে জেলার ৮০ শতাংশ অপরাধ।

এ পরিস্থিতির মধ্যেই অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশে আজ ২০ জুন পালিত হচ্ছে বিশ্ব শরণার্থী দিবস। জাতিসংঘের ঘোষণা অনুযায়ী ২০০১ সাল থেকে প্রতি বছর এ দিবসটি পালন করা হচ্ছে। জাতিসংঘের হিসাবে বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ৬ কোটি মানুষ শরণার্থী হিসেবে রয়েছে। এটি বিশ্বের ইতিহাসে শরণার্থী সংখ্যার সর্বোচ্চ রেকর্ড। মূলত যুদ্ধ, জাতিগত সন্ত্রাসই সাম্প্রতিক সময়ে শরণার্থী সংখ্যা বৃদ্ধির মূল কারণ। দিবসটি পালন উপলক্ষে এক বাণীতে জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন বলেন, শরণার্থীরা আমাদের মতোই মানুষ। মানুষের কারণেই তারা অস্বাভাবিক জীবন যাপনে বাধ্য হচ্ছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি এক বিবৃতিতে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী শরণার্থী জনগোষ্ঠীর জন্য গত বছরে ৬০০ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয় করেছে।

বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রকৃত সংখ্যা কত :কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্পে সরকারিভাবে তালিকাভুক্ত শরণার্থীর সংখ্যা ১৩ হাজার। অথচ এই ক্যাম্পে তালিকাবহির্ভূত আরও এক লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী অবস্থান করছে। অন্যদিকে টেকনাফের নয়াপাড়া ক্যাম্পে সরকারি তালিকাভুক্ত শরণার্থীর সংখ্যা প্রায় ১৯ হাজার। এই ক্যাম্পের আশপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে আরও প্রায় ৫০ হাজার রোহিঙ্গা। এ ছাড়া ক্যাম্প সংলগ্ন এলাকায় প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা অবস্থান করছে অবৈধভাবে। শুধু কক্সবাজার নয়, বান্দরবান, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে আরও প্রায় আড়াই লাখ রোহিঙ্গা। কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থী প্রত্যাবাসন কমিশনার ফরিদ আহমদ ভূইয়া বলেন, ৪ লাখের বেশি রোহিঙ্গা এখন বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে অবৈধভাবে অবস্থান করছে।

কুতুপালং ক্যাম্পে ঝুপড়ি ঘর তুলে অবস্থান করছে মিয়ানমারের বুচিদং এলাকার নজির আহমদ। শরণার্থী হিসেবে তালিকায় তার নাম আছে কি-না নিজেই জানেন না। সঙ্গে রয়েছে তার দুই পুত্রসন্তান। দুই শিশুকন্যাকে নিয়ে স্ত্রী দেশে রয়েছে। নজির আহমদের আয়-রোজগার চলে এ দেশে দিনমজুরি করে। কিছু টাকা জমলেই দেশে ঘুরে আসেন। সীমান্ত অতিক্রম করতে কোনো সমস্যা হয় না। তার ভাষায়, ‘বিজিবির হাতে ধরা দিলেই পুশব্যাক। এরপর সুযোগ বুঝে ফের ঢুকেপড়া।’ এই রোহিঙ্গা জানালেন, বিজিবির মাধ্যমে এই পর্যন্ত তিনবার পুশব্যাক হয়েছেন। পরে আবার অনুপ্রবেশ করেছেন।

ক্যাম্পের তালিকাভুক্ত শরণার্থী রাকিবুল্লাহ। পরিবার-পরিজন নিয়ে দুই যুগের বেশি সময় ধরে এখানে রয়েছেন। বাংলাদেশ সরকার এবং জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশন ইউএনএইচসিআরের দেওয়া সাহায্য-সহায়তা নিয়ে দিন ভালোই কাটছে তার। স্থানীয় বাজারে ক্ষুদ্র ব্যবসাও করছেন। কক্সবাজারের বাইরে চট্টগ্রাম গিয়েও ঘুরে এসেছেন। কোনো সমস্যা হয়নি বলে জানান তিনি।উখিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও রোহিঙ্গা প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী দিনাজপুর২৪.কমকে জানান, রোহিঙ্গারা এ দেশের শ্রমবাজার দখল করে নিচ্ছে। রোহিঙ্গাদের কারণে বেকার হয়ে পড়ছে স্থানীয়রা। তিনি জানান, মাছ ধরার ট্রলারে বেশিরভাগ শ্রমিক রোহিঙ্গা। কক্সবাজার ও বান্দরবানের ১৫ হাজার হেক্টর সরকারি বনভূমি এখন রোহিঙ্গাদের দখলে। রোহিঙ্গাদের অনেকেই নিজেরা বাংলাদেশি নাগরিক বিয়ে করছে এবং তাদের ছেলেমেয়েদের স্থানীয়ভাবে বিয়ে দিচ্ছে।

টেকনাফের সাবেক সাংসদ অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী বলেন, খুন-ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত হওয়ায় এরা আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য মারাত্মক হুমকির কারণ হয়ে উঠেছে।টেকনাফ উপজেলা চেয়ারম্যান জাফর আলম জানান, মিয়ানমারের সঙ্গে অসংখ্য বৈঠকের পরও রেজিস্টার্ড ৩২ হাজার রোহিঙ্গার প্রত্যাবাসন সম্পন্ন হয়নি গত ২৪ বছরে। অথচ দিন দিন রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ বাড়ছে। বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ৪ লাখ রোহিঙ্গার তৎপরতা নানা সামাজিক সংকট তৈরি করলেও এদের তালিকাভুক্ত করে নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং দেশে ফেরত পাঠানোর কোনো উদ্যোগ সরকারের পক্ষ থেকে দেখা যাচ্ছে না।কক্সবাজার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের এক কর্মকর্তা জানান, এই অফিসে পাসপোর্টের জন্য প্রতি মাসে প্রায় ৩ হাজার আবেদন জমা হয়। পুলিশের তদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার পরই পাসপোর্ট ইস্যু করা হয়। তিনি জানান, পুলিশের তদন্ত রিপোর্ট পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রতি মাসে শতাধিক আবেদনকারীর ঠিকানা শনাক্ত করা যায় না। যাদের ঠিকানা শনাক্ত করা যাচ্ছে না, তাদের বেশিরভাগই রোহিঙ্গা। জনপ্রতিনিধিরা জন্মনিবন্ধন সনদ দিচ্ছে বলেই রোহিঙ্গারা বাংলাদেশি ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে পাসপোর্ট পেয়ে যাচ্ছে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে জঙ্গি তৎপরতা :স্থানীয় বাংলাদেশি নাগরিকদের অভিযোগ, উখিয়া ও টেকনাফে দুটি রোহিঙ্গা ক্যাম্পেই রয়েছে জঙ্গি তৎপরতা। রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশনের (আরএসও) প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জঙ্গিরা দুটি ক্যাম্পে অবস্থান করছে। গোয়েন্দা সূত্র জানায়, এখানে কর্মরত কয়েকটি এনজিওর মাধ্যমে তুরস্ক ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে আসে অনুদানের অর্থ। এই অর্থ ব্যয় হচ্ছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গোপন জঙ্গি প্রশিক্ষণের পেছনে।কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প সংলগ্ন স্থানীয় একাধিক অধিবাসী দাবি করেন, রোহিঙ্গাদের আর্থিক ও মানবিক সহায়তার কথা বলে ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যর বিভিন্ন এনজিওর মাধ্যমে ইত্তেহাদুল জমিয়াতুল রোহিঙ্গা, রোহিঙ্গা ভয়েস, শরিকা আল হওয়াদী নামে কয়েকটি রোহিঙ্গা সংগঠন ৫০০ কোটি টাকা পেয়েছে। স্থানীয়দের সন্দেহ, এই টাকা ব্যয় হচ্ছে জঙ্গি কর্মকাণ্ডে। জামায়াত-শিবিরের মিছিলেও ক্যাম্পের অনেককে নিয়মিত অংশ নিতে দেখা গেছে বলে স্থানীয় একাধিক নাগরিক জানান।

সূত্র জানায়, ইত্তেহাদুল জমিয়াতুল রোহিঙ্গার সভাপতি আমেরিকা প্রবাসী ড. ওয়াকার উদ্দিন। এই সংগঠনের ২৫ সদস্য বিশিষ্ট কমিটিতে আছেন হাফেজ সালাউল ইসলাম, মো. ইউনুছ, শেখ ছালামত, শামসুল আলম, আবু আবদুল্লাহ, মৌলভী আবু ছালেহ, আবদুর রহমান, মৌলভী আবদুল্লাহ, হাফেজ নঈম, মৌলভী আবু ছালেহ, মাস্টার এনামসহ আরো কয়েকজন। কমিটির একাধিক সদস্য কুতুপালং ক্যাম্পেই অবস্থান করে তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।একাধিক সূত্র জানায়, জঙ্গি তৎপরতায় অভিযুক্ত সংগঠন আরএসওর শীর্ষ নেতা হাফেজ ছালাউল ইসলাম গত বছর কক্সবাজার থেকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে গ্রেফতার হলেও সম্প্রতি জামিনে মুক্ত হয়ে ফের জঙ্গি তৎপরতা শুরু করেছে। কক্সবাজার জেলা পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, হাফেজ সালাউলের পাসপোর্ট ফেরত পেতে তদবির করছেন আওয়ামী লীগের এক নেতা। মূলত, মাদকসহ অবৈধ ব্যবসার কাজে ব্যবহারের জন্যই একাধিক প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা রোহিঙ্গাদের প্রতি ‘উদার’ দৃষ্টিভঙ্গি দেখাচ্ছেন।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তোফায়েল আহমদ দিনাজপুর২৪.কমকে বলেন, উখিয়া ও টেকনাফে দুটি রোহিঙ্গা ক্যাম্প সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থানে হওয়ায় সহজে রোহিঙ্গারা অনুপ্রবেশ করে এখানে বসতি স্থাপন করছে। এত বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাকে শরণার্থী মর্যাদা প্রদান এবং মিয়ানমারে ফেরত পাঠনো সম্ভব হচ্ছে না। তাদের দ্বারা আইন-শৃঙ্খলা অবনতি এবং নানা অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। তাই এ দুটি ক্যাম্প অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার চিন্তা-ভাবনা করছে সরকার।প্রত্যাবাসন বন্ধ ১০ বছর ধরে :বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ শুরু হয় ১৯৭৮ সাল থেকে। পরে ১৯৯১ সাল থেকে তাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন শুরু হয়। ১৯৯১ থেকে ২০০৫ সালের জুন মাস পর্যন্ত প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারীকে ফেরত পাঠানো হয়। কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থী প্রত্যাবাসন কমিশনার ফরিদ আহমদ ভূইয়া জানান, ২০০৫ সালের শুরুতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কর্মসূচি শুরু হলেও ওই বছরের জুলাই মাস থেকে রোহিঙ্গা শরণার্থী প্রত্যাবাসন বন্ধ রয়েছে মিয়ানমারের অসহযোগিতার কারণে। (ডেস্ক)