বাবুল তালুকদার (দিনাজপুর) আজ ১ সেপ্টম্বর। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ১৯৭৮ সালের এই দিনে মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান দেশ ও জাতির ঐতিহাসিক প্রয়োজনে বিএনপি নামক একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করেন। যে দলের অনুসারীরা হবেন বহুদলীয় গণতন্ত্রে বিশ্বাসী, ধর্মীয় মূল্যবোধের ধারক ও বাহক। দেশপ্রেমে উজ্জীবিত সৎ ব্যক্তিত্ব ও বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ধারণায় অনুপ্রাণিত। তিনি নিজেও এসব গুণের অধিকারী ছিলেন। জিয়াউর রহমানের বিএনপি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশে শুরু হয় উন্নয়ন ও উৎপাদনের রাজনীতি। রাজনীতিতে আসার আগেও এই মহান নেতার একটি ঘটনাবহুল জীবন রয়েছে। সৈনিক জীবন থেকে শুরু করে স্বাধীনতার ঘোষণা, মুক্তিযুদ্ধ, রাষ্ট্র পরিচালনা সব ক্ষেত্রেই তার একটি সমুজ্জ্বল ভূমিকা রয়েছে। যা জাতি কোনদিন ভুলতে পারবে না।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর পর দেশে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন ঘটে। এখন দেশ ও জাতি এক চরম হতাশায় নিমজ্জিত, দিশেহারা, চরম সংকটে পতিত। ঠিক সেই মুহূর্তে এ দেশের সিপাহী জনতা একই বছরের ৭ নবেম্বর শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে বন্দীদশা থেকে মুক্ত করে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় বসায়। এভাবেই একজন কর্মকর্তা হিসাবে জিয়াউর রহমানের আবির্ভাব। তিনিই প্রথম দেশে আওয়ামী লীগের গড়া একদলীয় বাকশালের পরিবর্তে বহুদলীয় গণতন্ত্র চালু করেন। ১৯৭৮ সালের এই দিনে বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন।

বিএনপির ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দলের চেয়ারপার্সন বাণী দিয়েছেন। দিবসটি পালনে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনগুলো নানা কর্মসূচি পালন করছে। এছাড়া বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম ও মিডিয়া ক্রোড়পত্র প্রকাশসহ বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে।

বিএনপি প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান দেশের রাজনীতিতে গণতন্ত্রের পাশাপাশি এনে দেন আমাদের জাতিসত্তার পরিচয়, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের। জিয়াউর রহমানের উন্নয়ন, উৎপাদন ও গণতান্ত্রিক আদর্শ লালন করেই বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর থেকে পাঁচ পাঁচ বার বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হয়েছে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাৎ বরণের পর দলের বর্তমান চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াও এক যুগসন্ধিক্ষণে দলের দায়িত্ব নিয়ে একের পর এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেন। স্বৈরাচারী এরশাদের আমলে তিনি আন্দোলন করে আপসহীন নেত্রী উপাধি পান। তার নেতৃত্বে বিএনপি তিনবার ক্ষমতায় আসীন হয়। বিভিন্ন ধরনের ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে বিএনপি আজ তাদের ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করছে।

বিএনপিকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি ষড়যন্ত্র হয়েছিল গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে। বিএনপির দাবি সেই সময়কার সেনা সমর্থিত সরকারের উদ্দেশ্য ছিল বিএনপিকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া। এজন্য তারা দলের চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে মিথ্যা মামলা দিয়ে গ্রেফতার করে। আটক করে তার দুই ছেলেকে। গ্রেফতার থেকে বাদ যায়নি দলের সিনিয়র নেতারাও। তারা বিএনপিকে দুইভাবে বিভক্ত করে সংস্কার ইস্যুকে কেন্দ্র করে দল প্রায় দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। দীর্ঘ এক বছর কারাভোগের পর মুক্তি পেয়ে আবারও দলকে সুসংগঠিত করে তোলেন বেগম খালেদা জিয়া।

বিএনপি নেতাদের দাবি, দলের প্রতিটি নেতাকর্মীর প্রত্যয়দীপ্ত বলিষ্ঠ প্রতিরোধের মুখে সকল ষড়যন্ত্র নস্যাৎ হয়েছে। তারা অভিযোগ করছে, বর্তমান আ’লীগ সরকারও বিএনপিকে ধ্বংস করার জন্য ষড়যন্ত্র করছে। তাই জিয়া ও খালেদা নামে নামকরণকৃত সবকিছু নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হচ্ছে। বর্তমান সরকার বেগম খালেদা জিয়াকে তার ৪০ বছরের স্মৃতি বিজড়িত ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে জোর করে এক কাপড়ে বের করে দিয়েছে। তার দুই ছেলে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোর বিরুদ্ধে নতুন মামলা দিয়ে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। তাদের পলাতক দেখিয়ে মামলার চার্জশীট দেয়া হয়েছে। মামলা দেয়া হয়েছে বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধেও। এরই মধ্যে বিদেশে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন আরাফাত রহমান কোকো।

বাংলাদেশের জনগণের ভাগ্য উন্নয়নে যে বিএনপির প্রচেষ্টা দীর্ঘ ৩৬ বছর পরও সে লক্ষ্য অর্জনে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। তাদের দাবি দেশের অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নারী উন্নয়ন, কৃষি, বিজ্ঞান প্রযুক্তি, গ্রামীণ অবকাঠামোর উন্নয়ন, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নসহ সব সাফল্য বিএনপি সরকারের আমলেই হয়েছে। জিয়াউর রহমান সংবিধানে বিসমিল্লাহ সংযোজনসহ ইসলামী মূল্যবোধকে জাগ্রত করেছেন।

কর্মসূচি: আজ মঙ্গলবার ঢাকায় নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ভোরে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। সকাল ১০টায় বিএনপি চেয়ারপার্সন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও ২০ দলীয় জোট নেতা বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ শেরেবাংলা নগরস্থ শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মাজারে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ ও ফাতেহা পাঠ করবেন। এছাড়া বিকেল ৩ টায় কাকরাইলস্থ ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউট কাউন্সিল হলে বিএনপির উদ্যোগে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। এতে প্রধান অতিথি থাকবেন বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া। এছাড়া থাকবে স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচি। দলটির এক বিজ্ঞপ্তিতে বিএনপি ও তার অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীকে দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন এবং যথাসময়ে জিয়াউর রহমানের মাজারে উপস্থিত থাকার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।

কর্মসূচি পালনে বাধা: বিএনপির ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচিতে সরকারদলীয় সন্ত্রাসী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বাধা সৃষ্টি করছে বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি। দলটির অভিযোগ, সারা দেশে এখন পর্যন্ত ৫০টি জেলা ও ৪০০টি উপজেলায় দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে হাতে নেওয়া নানা কর্মসূচিতে বাধা দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর জন্য বিভিন্ন স্থানে তৈরি করা প্যান্ডেল ভেঙে দেওয়া হয়েছে। নেতাকর্মীদের মারধর করা হচ্ছে। পোস্টার, ব্যানার ছিঁড়ে ফেলা হচ্ছে।

রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গতকাল দুপুরে দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে নেতাদের নিয়ে সমন্বয় সভা শেষে দলটির মুখপাত্র ড. আসাদুজ্জামান রিপন এ সব অভিযোগ করেন।

তিনি বলেন, নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে বিএনপি তার ৩৭তম প্রতিষ্ঠাতা বার্ষিকী পালন করতে যাচ্ছে। সরকার সারাদেশে আমাদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপনে বাধা দিচ্ছে। আমাদের দলের প্রতিষ্ঠাতাবার্ষিকীর পোস্টার, ব্যানার, বেলুন উড়াতে দিচ্ছে না। বিভিন্ন স্থানে প্যান্ডেল ভেঙে ফেলছে। শেরেবাংলা নগরে বিএনপি প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সমাধিতে ‘জিসাস’ আয়োজিত স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচির প্যান্ডেলও সোমবার দুপুরে পুলিশ ভেঙে দিয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। -ডেস্ক