(দিনাজপুর২৪.কম) রক্তাক্ত ১৫ আগস্টের শোককে শক্তিতে পরিণত করে সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠায় আত্মনিয়োগ করার আহবান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে দেয়া আলাদা আলদা বাণীতে তারা এ আহ্বান জানান। রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে বলেন, যতদিন এ দেশ ও জনগণ থাকবে ততদিন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নাম এ দেশের লাখো-কোটি বাঙালির অন্তরে চির অমলিন ও অক্ষয় হয়ে থাকবে। তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা ও বাঙালি জাতির ইতিহাসে ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ এক বেদনাবিধুর ও কলঙ্কজনক অধ্যায়। এদিন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু দেশের স্বাধীনতা বিরোধী ষড়যন্ত্রকারীদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে ঘাতকচক্রের হাতে স্ত্রী, পুত্র, পুত্রবধূ এবং নিকট আত্মীয়সহ শাহাদাৎবরণ করেন।
ঘাতকচক্র জাতির পিতাকে হত্যা করলেও তাঁর আদর্শ ও নীতিকে নিঃশেষ করতে পারেনি উল্লেখ করে আবদুল হামিদ বলেন, আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং স্বাধীনতা অর্জনে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধুর অবদান অপরিসীম। তাঁরই নেতৃত্বে বাঙালি জাতি অর্জন করে বহু কাক্সিক্ষত স্বাধীনতা। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর চিন্তাচেতনায় সবসময় কাজ করত বাংলা, বাঙালি ও বাংলাদেশ। তিনি ছিলেন বাঙালি জাতির স্বপ্নদ্রষ্টা এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা।
রাষ্ট্রপতি বলেন, বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে এ দেশের আপামর জনগণ মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং ন’মাস সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জন করে বহু কাক্সিক্ষত স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য এ দেশের মানুষের কাছে বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ এক ও অভিন্ন সত্ত্বায় পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, জাতির পিতার সারাজীবনের স্বপ্ন ছিল দেশকে ‘সোনার বাংলা’য় পরিণত করা। আমাদের দায়িত্ব হবে, বঙ্গবন্ধুর অসম্পূর্ণ কাজকে সম্পূর্ণ করে দেশকে একটি সুখী ও সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করে তাঁর সেই স্বপ্ন পূরণ করা। তাহলেই আমরা চিরঞ্জীবী এই মহান নেতার প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করতে পারব।
রাষ্ট্রপতি বলেন, বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করতে ‘ভিশন ২০২১’ এবং এরই ধারাবাহিকতায় ‘ভিশন ২০৪১’ ঘোষণা করেছেন। বাংলাদেশ আজ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে চলেছে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস স্বাধীনতার হীরক জয়ন্তীতে বাংলাদেশ বিশ্বে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হবে। তিনি জাতীয় শোক দিবসে শোকাহত চিত্তে ’৭৫ এর ১৫ আগস্ট শহিদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে তাঁদের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন। একইসঙ্গে রাষ্ট্রপতি জাতীয় শোক দিবসে শোককে শক্তিতে পরিণত করে দেশ গঠনে আত্মনিয়োগ করার জন্য সকলের প্রতি আহবান জানান।
এদিকে জাতির পিতাকে হারানোর শোককে শক্তিতে পরিণত করে তাঁর স¦প্ন সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠায় আত্মনিয়োগ করার আহবান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত, শান্তিপূর্ণ, সমৃদ্ধ, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার এ সংগ্রামে আমাদের অবশ্যই জয়ী হতে হবে। জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে মহান আল্লাহ তায়ালার দরবারে জাতির পিতাসহ সেদিনের সকল শহিদের রুহের মাগফেরাত কামনা করে তিনি বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দূরদর্শী, সাহসী এবং ঐন্দ্রজালিক নেতৃত্বে বাঙালি জাতি পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে ছিনিয়ে এনেছিল স¦াধীনতার রক্তিম সূর্য। বাঙালি পেয়েছে স¦াধীন রাষ্ট্র, নিজস¦ পতাকা ও জাতীয় সংগীত।
বাণীতে সংসদ নেতা বলেন, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে বঙ্গবন্ধু যখন সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে সোনার বাংলা গড়ার সংগ্রামে নিয়োজিত, তখনই স¦াধীনতাবিরোধী-যুদ্ধাপরাধী চক্র জাতির পিতাকে হত্যা করে। এর মধ্য দিয়ে তারা বাঙালির ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, কৃষ্টি ও অগ্রযাত্রাকে স্তব্ধ করার অপপ্রয়াস চালায়। অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামোকে ভেঙে ফেলাই ছিল তাদের মূল লক্ষ্য। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের পর থেকেই এই জঘন্য হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িত স¦াধীনতাবিরোধী চক্র হত্যা, ক্যু ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি শুরু করে। ইনডেমনিটি অর্ডিনেন্স জারী করে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের পথ বন্ধ করে দেয় বলে বাণীতে তিনি উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জিয়াউর রহমান অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে এবং মার্শাল ল’ জারীর মাধ্যমে গণতন্ত্রকে হত্যা করে। সংবিধানকে ক্ষত-বিক্ষত করে। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের পুরস্কৃত করে। দূতাবাসে চাকুরি দেয়। স¦াধীনতাবিরোধী-যুদ্ধাপরাধীদের নাগরিকত্ব দেয়। রাষ্ট্রক্ষমতার অংশীদার করে। রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে পুনর্বাসিত করে। পরবর্তী বিএনপি-জামায়াত সরকারও একই পথ অনুসরণ করে।
বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের খুন, হত্যা, দুর্নীতি এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুঃশাসনের অবসান ঘটিয়ে দেশের জনগণ ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে বিপুল ভোটে বিজয়ী করে উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে পূর্ববর্তী সরকারগুলোর রেখে যাওয়া অচলাবস্থা এবং বিশ্বমন্দা কাটিয়ে আমরা ২০০৯-২০১৩ মেয়াদে দেশকে দৃঢ় অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করাই। উন্নয়নের এই ধারাবাহিকতা ও সংবিধানকে সমুন্নত রাখতে দেশের জনগণ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে পুনরায় আমাদের বিজয়ী করে।’
শেখ হাসিনা বলেন, নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী গত সাড়ে ছয় বছর তার সরকার দেশের উন্নয়নে ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ নি¤œ মধ্যআয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। বাংলাদেশকে ২০২১ সালের আগেই উচ্চ মধ্যমআয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করা তার লক্ষ্য বলে বাণীতে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, আমরা সপরিবারে জাতির পিতার হত্যার বিচারের রায় কার্যকর করেছি। জাতীয় চার নেতা হত্যার বিচার সম্পন্ন হয়েছে। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী-মানবতাবিরোধীদের বিচারের রায় কার্যকর হচ্ছে। ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলাকারীদের বিচারকাজ চলছে। আমরা গণতন্ত্র ও আইনের শাসনকে সমুন্নত রেখেছি। কোনো ষড়যন্ত্রই আমাদের সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা থেকে বিচ্যুত করতে পারবে না।
বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেন, ঘাতকচক্র বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করলেও তাঁর স¦প্ন ও আদর্শের মৃত্যু ঘটাতে পারেনি। বঙ্গবন্ধুর ত্যাগ ও তিতিক্ষার দীর্ঘ সংগ্রামী জীবনাদর্শ বাঙালি জাতির অন্তরে প্রোথিত হয়ে আছে। জাতির পিতাকে হারানোর শোককে শক্তিতে পরিণত করে তাঁর স¦প্ন সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠায় আত্মনিয়োগ করার আহবান জানান তিনি।
প্রসঙ্গত আজ ১৫ আগস্ট, জাতীয় শোক দিবস। ১৯৭৫ সালের এ দিনে মানব ইতিহাসের বর্বরতম হত্যাকা-ের শিকার হন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ঘৃণ্য ঘাতকরা এই দিনে বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব, পুত্র ক্যাপ্টেন শেখ কামাল, লেফটেন্যান্ট শেখ জামাল, ১০ বছরের শিশু স্কুলছাত্র শেখ রাসেল, পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজী জামাল, বঙ্গবন্ধুর সহোদর শেখ নাসের, কৃষকনেতা আবদুর রব সেরনিয়াবাত, যুবনেতা শেখ ফজলুল হক মণি ও তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মণি, বেবী সেরনিয়াবাত, সুকান্ত বাবু, আরিফ, আব্দুল নঈম খান রিন্টুসহ পরিবারের ১৮ জন সদস্যকেও হত্যা করে। বঙ্গবন্ধুর সামরিক সচিব কর্নেল জামিলও নিহত হন ঘাতকদের হাতে।-ডেস্ক