(দিনাজপুর২৪.কম) অবশেষে ছাড় পাচ্ছে না পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের আওয়ামী লীগের নৌকাবিরোধী মন্ত্রী-এমপিসহ দলীয় নেতাকর্মীরা। দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানেই থাকছে ক্ষমতাসীন দলটির হাইকমান্ড। নৌকাবিরোধী ও মদতদাতাদের চিহ্নিত করে প্রায় দেড়শ নেতা দলীয় রেড নোটিস পাচ্ছেন। আজ থেকে শোকজ নোটিস পাঠানো হবে।

নোটিসে কারণ দর্শানোর জন্য বলা হবে, জবাব সন্তোষজনক না হলে সাময়িকসহ স্থায়ী বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে। দলটির এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে ফেঁসে যাবে দলটির সাবেক ও বর্তমান মন্ত্রী-এমপিরা।

জানা গেছে, গত পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে সারা দেশে প্রায় পাঁচ শতাধিক নেতা আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে গিয়ে নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছিলেন। যার মধ্যে প্রায় দুই শতাধিক নেতা স্থানীয় আওয়ামী লীগ-যুবলীগসহ বিভিন্ন সংগঠনের দায়িত্বশীল পদ-পদবীতে রয়েছেন।

শুধু দলীয় নেতাকর্মীরাই নয়, অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে স্থানীয় সাংসদ ও সাংসদপন্থি নেতারাও ভোটের মাঠে নৌকা প্রতিকের বিরোধিতা করেন। এমন অবস্থায় গত ২৯ মার্চ আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে দলের নির্বাহী কমিটির সভায় দলীয় শৃঙ্খলা না মানা নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

এরপর নৌকাবিরোধী ও মদতদাতাদের চিহ্নিত করতে কাজ শুরু করেন আওয়ামী লীগের আট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকরা। দেশে বিভিন্ন ইস্যুতে কার্যক্রম কিছুটা পিছিয়ে গেলেও অবশেষে নৌকাবিরোধী ও মদতদাতাদের ১৫০ সদস্যের তালিকা চূড়ান্ত করেছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা।

সেই তালিকা অনুযায়ী আজ থেকে সারা দেশে ১৫০ জনের মতো নেতাকর্মীকে শোকজ নোটিস পাঠানো হবে। তিন সপ্তাহের মধ্যে শোকজের জবাব দিতে বলা হবে। প্রথমে কারণ দর্শানোর চিঠি, চিঠির জবাব সন্তোষজনক না হলে বহিষ্কারের মতো সিদ্ধান্ত কার্যকরের নির্দেশনা নেবে আওয়ামী লীগ।

দলীয় সূত্র জানায়, এর আগেও বিভিন্ন সময় দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে অনেক নেতাকে কারণ দর্শানোর নোটিস দিয়েছিলো আওয়ামী লীগ। তবে শেষ পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে কঠোর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি ক্ষমতাসীনরা।

তবে গত পঞ্চম উপজেলা নির্বাচনে দলীয় সাংসদসহ নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে নৌকার বিরোধিতা করেন। এমন অবস্থায় তৃণমূলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। অনেক স্থানে হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়েন দলটির নেতাকর্মীরা। নিহত হয় বেশ কয়েকজন দলীয় নেতাকর্মী।

এ কারণে এবার আর কেউ ছাড় পাচ্ছে না। সেজন্য প্রথমে দলীয় পদ থেকে অব্যাহতি দেয়া হচ্ছে বিদ্রোহী প্রার্থী ও মদতদাতাদের। পরবর্তীতে দলের সব পদ থেকে অব্যাহতি দেয়া হবে।

একই সঙ্গে আগামীতে এসব ব্যক্তি যেন দলের পদ-পদবীতে আসতে না পারে সেজন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করবে দলটি। আবার অনেকের পদ-পদবীতে থেকে অব্যাহতি দেয়া না হলেও ‘সময় মতো’ উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করা হতে পারে।

তথ্য মতে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনের পর তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ সরকার। অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে ভোট ডাকাতির অভিযোগ তুলে নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে বিএনপিসহ সরকার বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো।

এরপর পঞ্চম উপজেলা নির্বাচন বর্জন করেন তারা। এমন অবস্থায় নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে অনেকটাই চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়ে ক্ষমতাসীন দলটি। এমন পরিস্থিতিতে ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থিতা উন্মুক্ত করে দেন।

চেয়ারম্যান পদে দলীয় প্রতীক রাখেন তারা। কিন্তু তাতে বেশি সমস্যার মধ্যে পড়ে দলটি। বিশেষ করে স্থানীয় সাংসদ ও দলের দায়িত্বশীল নেতাকর্মীদের প্রকাশ্যে পক্ষপাতিত্বে অনেকটাই কোণঠাসা হয়ে পড়ে দলটি তৃণমূল।

নির্বাচন পরবর্তীতে বিদ্রোহী ও মদতদাতাদের বিরুদ্ধে দলীয় শাস্তি কার্যকর করার জন্য বেশকিছু উদ্যোগ গ্রহণ করে। কিন্তু হঠাৎ সারা দেশে গুজব, বন্যা ও ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়ে বেশ চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়ে ক্ষমতাসীন দলটির নেতাকর্মীরা। তবে সেই সমস্যা থেকে কেটে ওঠে ওই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে।

আ.লীগ সূত্রে জানা যায়, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের পঞ্চম উপজেলা নির্বাচনে দলীয় প্রতীকের বিরোধিতা ও মদতদাতাদের নাম প্রকাশ না করলেও বিভিন্ন সময় বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে আসা বেশকিছু সাংসদ ফেঁসে যেতে পারেন।

শুধু সাংসদ নয়, বেশকিছু জেলা-উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি-সম্পাদকের নাম এই তালিকায় রয়েছে। যাদের নামে আওয়ামী লীগের শোকজ যেতে পারে- নাটোর-১ আসনে আওয়ামী লীগের এমপি শহীদুল ইসলাম বকুল।

কারণ তার আপন ছোট ভাই নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন। চুয়াডাঙ্গা-২ আসনে আওয়ামী লীগের এমপি আলী আজগার টগর। তিনি তার ভাইকে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে ভোটের মাঠে দাঁড় করিয়েছিলেন।

ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় যুবলীগ নেতা জাহিদুল ইসলামকে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে দাঁড়াতে মদদ দিয়েছিলেন স্থানীয় এমপি মুনজুর হোসেন বুলবুল।

সুনামগঞ্জ-১ আসনে আওয়ামী লীগের এমপি ইঞ্জিনিয়ার মোয়াজ্জেম হোসেন রতন। তিনি সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলায় তার ছোট ভাইকে বিদ্রোহী প্রার্থী করেছিলেন এবং তার হয়ে কাজ করেছেন। সাবেক নৌ-পরিবহণমন্ত্রী শাজাহান খান। তিনি তার আপন ভাইয়ের জন্য ভোটের মাঠে কাজ করেছেন।

এছাড়া নাটোর-৪ আসনের এমপি অধ্যাপক আবদুল কুদ্দুস, গুরুদাসপুর ও বড়াইগ্রাম উপজেলায় আওয়ামী লীগ মনোনীত দুই উপজেলা চেয়ারম্যান প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ভোটের মাঠে কাজ করেছেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ আসনের সংসদ সদস্য এবাদুল করিম বুলবুল, তথ্য ও যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের সাংসদ ও জেলা আ.লীগের সভাপতি সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার, তার ভাই দলীয় মনোনয়ন না পাওয়ায় নৌকার বিরোধীতা করেন তিনি।

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম আমার সংবাদকে বলেন, যারা উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দলীয় প্রতীকের বিরুদ্ধে গিয়ে ভোটের মাঠে কাজ করেছেন এবং তৃণমূল পর্যায়ে দলীয় নেতাকর্মীদের মাঝে বিভেদ তৈরি করেছেন তাদের ছাড় দেয়া হবে।

তিনি বলেন, অনেক বড় নেতা, বড় এমপি, বড় মন্ত্রী কেউ রেহাই পাচ্ছেন না। জেলাপর্যায়ের সভাপতি-সম্পাদককেও ছাড় নয়। সবার শাস্তি কার্যকর হবে। কেউ দলের শৃঙ্খলার বাইরে না।

তিনি আরও বলেন, এর আগে কোনো দিন দলীয় শৃঙ্খলার অভিযোগে এভাবে শোকজ করা হয়নি। এই প্রথম শোকজ করা হচ্ছে। এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের মধ্যদিয়ে সাংগঠনিকভাবে আওয়ামী লীগের আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি হবে।

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গতকাল সাংবাদিকদের জানান, উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে যারা বিদ্রোহী ছিল, তাদের শোকজের সিদ্ধান্ত আগে থেকেই ছিল।

আজকে সেটা বাস্তবায়নের প্রসেস কিভাবে দ্রুত করা যায়, সেটা আলোচনা করেছি। আগামীকাল (আজ) থেকে ১৫০ জনের মতো নেতাকে শোকজ নোটিস ইস্যু করা হবে। শোকজের জবাবের জন্য তিন সপ্তাহ সময় দেয়া হবে।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, এমপি-মন্ত্রী যারা মদতদাতা তারাও শোকজ পাবেন। মদতদাতাদের মধ্যে কেন্দ্রীয় নেতাও থাকতে পারেন। যাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও মদদ দেয়ার অভিযোগ আছে, তারা সবাই শোকজ পাবেন। -ডেস্ক