তুষার কণা খোন্দকার(দিনাজপুর ২৪.কম) আমাদের দেশে লোকমুখে অনেক অসাধারণ গল্প চালু আছে, যার কোনো লিখিত রূপ পাওয়া যায় না। গল্পগুলো লিখে রাখার প্রয়োজন পড়ে না কারণ মানুষের মুখে বহুল ব্যবহারের গুণে ওগুলো সব যুগেই আধুনিক। নিত্যদিন গল্পগুলোর বাস্তব প্রয়োগ আমাদের চোখের সামনে ঘটতে থাকে। দেশে এখন বিরোধী দল নেই। রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগের অস্তিত্ব সমাজে টের পাওয়া যায় না। চোখের সামনে দল হিসেবে একটি দলই এখন দেশে দাপিয়ে ফিরছে, সেটি সরকারি দল। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আমাদের গ্রামে-গঞ্জে লোকমুখে চালু একটি গল্প খুব মনে পড়ছে। সরকারি দলের লোকদের পরিচয় খুঁজতে গিয়ে লোকচলতি সেই গল্পটা বলি, আপনারা শুনুন। বৃষ্টি-বাদলের দিনে পিচ্ছিল পথে হাঁটতে গিয়ে একদিন এক লোক পা ফসকে গাঙের পানিতে পড়ে গেছে। ভরা বর্ষায় গাঙের পানিতে ভীষণ স্রোত। স্রোতের তোড় ঠেলে লোকটা সাঁতার কেটে পাড়ে আসতে না পেরে ডুবে মরতে বসেছিল। সেই অবস্থায় বাঁচার আশায় সে ডাকচিৎকার জুড়ে দিয়ে বলল, ‘বাঁচাও, বাঁচাও! সরকারি লোক ডুবে মরল’। ডুবন্ত সরকারি লোকের পদের গুরুত্ব বুঝে লোকজন ছুটে এসে কেউ পানিতে নেমে কেউবা দড়ি ছুড়ে দিয়ে তাকে টেনে-হিঁচড়ে পানি থেকে তুলে পাড়ে বসিয়ে বলল, ‘ওমা! তুমি নামাপাড়ার রহিমুদ্দি না? তুমি আবার সরকারি লোক হলে কবে?’ বাঁচার আনন্দে লোকটি একগাল হেসে সরকারের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতার সূত্র বাখান করে বলল, আমি কেন সরকারি লোক সে কথা তোমরা মন দিয়ে শোন, সেই যে থানায় আছে দারোগা। সেই দারোগার নৌকার মাঝি, তার যে পাকায় কাছি, তার যে জোগায় গুছি, আমি তার বাড়ির কাছে আছি। তোমরাই বল, আমি কি সরকারি লোক নই?’ সরকারের চারপাশে এখন নামাপাড়ার রহিমুদ্দির মতো সরকারি লোকের বেজায় ভিড়। বর্তমানে আওয়ামী লীগের নেতারা ক্ষমতায় আছে বলে রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ সরকারে আছে এটা বিশ্বাস করা কঠিন। আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক দল হিসেবে বেঁচে থাকলে সরকার এভাবে আমলা-পুলিশের ঘাড়ে সোয়ার হয়ে সরকার চালানোর গ্লানি গায়ে টেনে নিত না। আওয়ামী লীগ সরকারে আছে কি নেই সেটা জানা না থাকলেও সরকার যে ‘নামাপাড়ার রহিমুদ্দির’ মতো সরকারি লোকে ছেয়ে গেছে এতে আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের মনেও কোনো সন্দেহ নেই। তাদের মনের সন্দেহ ইদানীং বিভিন্ন সভা-সমিতিতে তারা অকপটে স্বীকার করতে দ্বিধা করছেন

পাঁচই আগস্ট বঙ্গবন্ধুর বড় ছেলে শেখ কামালের ৬৬তম জন্মবার্ষিকী পালিত হলো। তারই এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেছেন, দেশে এখন বিরোধী দল নেই। দেশে বিরোধী দলের অস্তিত্ব না থাকায় আওয়ামী লীগের সংকট আরও বেড়ে গেছে। তার কথায় মনে হলো, সুযোগ সন্ধানী উটকো লোকজনের ভারে আওয়ামী লীগ ডুবতে বসেছে। বর্তমানে আওয়ামী লীগের মধ্যে নব্য আওয়ামী লীগারের ভিড় দেখে নাসিম আতঙ্কিত। দেশে বিরোধী দলের অস্তিত্ব না থাকায় সুযোগ সন্ধানীরা সবাই শাসক দলে ভিড় করছে। এদের মধ্যে অনেকে বড় বড় পদ দখল করেছে আবার অনেকের গায়ে আওয়ামী সিল মারা সাধারণ কর্মীর খোলস। দিনের শেষে এদের একটিই পরিচয় এরা ‘সরকারি লোক’। নাসিম রাখঢাক না রেখে বিষয়টা স্পষ্ট ভাষায় আমাদের সামনে বলেছেন বলে তাকে আন্তরিক ধন্যবাদ। শেখ কামালের জন্মবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে নাসিম সরাসরি বলেননি দেশে একদলীয় শাসন চলছে। তবে সরাসরি না বললেও তার বক্তব্যের সারকথায় দেশে চালু থাকা একদলীয় শাসনের বাস্তবতা চাপা থাকেনি। নাসিম পরীক্ষিত রাজনীতিবিদ, তিনি ‘সরকারি লোক’ নন। তার মতো রাজনীতিবিদের পক্ষে সস্তা চাটুকারিতার পথ বেছে নিয়ে জনগণকে অলীক গল্প শোনানো কঠিন। রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বর্তমান দুঃসময়ে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীকে মুখ ফুটে কঠিন সত্য বলতে হচ্ছে। দেশে একদলীয় শাসনের পরিণাম কী হতে পারে সেটা নাসিম জানেন। সেটা জানেন বলে সেদিনের সভায় তিনি পঁচাত্তরের পরিণামের সূত্র টেনে এনে নিজ দলকে সাবধান করেছেন। নাসিমের কথায় বোঝা যায়, ‘৭৫ সালে দেশে একদলীয় বাকশাল শাসন কায়েম হয়েছিল বলে সুযোগ সন্ধানী ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার দুঃসাহস দেখিয়েছিল। ১৫ আগস্টের বেদনাদায়ক ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেছেন, বর্তমান একদলীয় শাসনের পরিণাম হিসেবে দেশে পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তিনি অবাক হবেন না। আজন্ম আওয়ামী লীগের কর্মী নাসিম বাকশাল গঠনের আগে-পরে আওয়ামী লীগের বাস্তবতা নিজ অভিজ্ঞতার আলোকে বিশ্লেষণ করতে পারেন। নিজ জীবনের অভিজ্ঞতার নিরিখে বর্তমান একদলীয় শাসনের ভঙ্গুর দিক তিনি দেখতে পাচ্ছেন। সেই কারণে তার মনে আর একটি ১৫ আগস্টের আতঙ্ক ঘনিয়ে এসেছে এবং সেই আতঙ্ক তিনি জনসম্মুখে প্রকাশ করতে দ্বিধা করেননি। ১৯৭৫ সালের ৭ জুন সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে বাকশাল গঠিত হয়েছিল। বাকশাল গঠনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ দল হিসেবে নিজের অস্তিত্ব বিলোপ করেছিল। সেই সঙ্গে দেশে সব রাজনৈতিক দলের বিলুপ্তি ঘোষণা করে বাকশালকে একমাত্র রাজনৈতিক দল ঘোষণা করা হয়েছিল। পাকিস্তান আমলে আওয়ামী লীগ সবসময় গণতন্ত্রের আন্দোলনে সামনের সারিতে ছিল। আওয়ামী লীগ কাদের বুদ্ধিতে ক্ষমতা পাকা করার কমিউনিস্ট স্টাইল রপ্ত করেছিল সে কথা এখন কারও অজানা নেই। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ন্যাপ কিংবা কমিউনিস্ট পার্টির মতো জনবিচ্ছিন্ন নেতাসর্বস্ব দলগুলো ক্ষমতার স্বাদ খাওয়ার জন্য শর্ট-কাট পথ খুঁজছিল। ১৯৭৫ সালে বাকশাল গঠনের মধ্য দিয়ে তাদের ক্ষমতার ভাগ পাওয়ার ইচ্ছা পূরণ করেছিল তার প্রমাণ বাকশালের শাসনে মন্ত্রিসভা এবং বাকশালের কেন্দ্রীয় কমিটির তালিকা পরীক্ষা করে যে কেউ জেনে নিতে পারেন। বর্তমানে আওয়ামী লীগ প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে বাকশাল গঠন করেনি, তবে তারা হামলা-মামলা-প্রলোভনের জাল ফেলে বিরোধী দলের অস্তিত্ব ধ্বংস করার ভয়ঙ্কর খেলায় মেতেছে। ত্যাগী আওয়ামী লীগাররা এতে কতটুকু সায় দিচ্ছে সেটা নিয়ে আমার মনে সন্দেহ আছে। দেশে একদলীয় শাসন পরিস্থিতি নিয়ে নাসিমের বক্তব্য আমার সন্দেহকে পোক্ত করেছে। কিছু ‘সরকারি লোক’-এর কুপরামর্শে দেশ যদি এভাবে চলতে থাকে তাহলে তার পরিণাম কী হতে পারে সেটা ভেবে নাসিমের মতো আমরাও আতঙ্কিত। নাসিম যৌক্তিক কারণে ‘আরেকটি পঁচাত্তর’ আশঙ্কা করছেন এবং সেটি সত্য প্রমাণিত হলে এ দেশের গণতন্ত্রমনা, প্রগতিশীল চিন্তার মানুষগুলো তপ্ত তাওয়া থেকে জ্বলন্ত চুলি্লতে পড়বে। ১৯৭৫ সালে ৭ জুন বাকশাল গঠনের পরে ‘সরকারি লোক’রা স্লোগান দিত ‘এক নেতা এক দেশ, বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ’। ১৫ আগস্ট ভয়াল রাতে গুলির আঘাতে যখন সব শেষ হয়ে গেল তখন আওয়ামী লীগের ত্যাগী নেতাদের চরম মাশুল গুনতে হয়েছিল। হত্যাকারীরা আওয়ামী লীগের চার কেন্দ্রীয় নেতাকে জেলের ভিতর বন্দী অবস্থায় হত্যা করেছিল। তৎকালীন ‘সরকারি লোক’দের জানমালের ওপর কোনো আঘাত এসেছিল বলে মনে পড়ে না। আজকের দিনে বিরোধী দল দমনকারী অতি উৎসাহী ‘সরকারি লোকরা’ আওয়ামী লীগের দুর্দিন এলে কি আওয়ামী লীগের পাশে থাকবে?

‘সরকারি লোকরা’ আওয়ামী লীগের দুর্দিনে আওয়ামী লীগের পাশে থাকবে কিনা সে প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গিয়ে আমাকে মোগল সম্রাট বাবরের আত্মজীবনী বাবরনামার আশ্রয় নিতে হচ্ছে। বাবর তার দুর্ধর্ষ মোগল সেনাদল নিয়ে বিহার জয় করে শোন্ নদীর কিনারে শিবির করে যখন বিশ্রাম নিচ্ছিলেন তখন আমাদের বাংলা মুল্লুক সম্পর্কে তিনি লিখেছিলেন, ‘শোন্ নদীর ওপারে বঙ্গাল মুলুক। বঙ্গাল মুলুকের লোকগুলো বড় আজব। ওখানকার বাসিন্দারা নাকি কোনো নেতার পূজা করে না। ওরা শুধু সিংহাসনের পূজা করে। এক রাজাকে মেরে আরেকজন কেউ সিংহাসন দখল করলে লোকগুলো প্রতিবাদ না করে সিংহাসনের পূজা চালিয়ে যেতে থাকে।’ কয়েকশ বছর পরেও বাবরের বিবেচনা কতখানি সত্য তার প্রমাণ ‘৭৫ সালেও আমরা পেয়েছি। ১৫ আগস্টে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে খোন্দকার মোশতাক ক্ষমতা দখল করেছিল। তিন মাস পরে খোন্দকার মোশতাক ক্ষমতার বলয় থেকে ছিটকে পড়ে দেশ ত্যাগ করেনি, সে তার পুরান ঢাকার আগামসি লেনের বাড়িতে নিশ্চিন্তে বসবাস করেছে। তার বসবাসের বাড়িটি সেনা বেষ্টিত দুর্গ ছিল না। বাড়ির গেটে দুটো দুর্বল পুলিশ দিনভর পাহারা দিলেও পুরো বাড়ি অরক্ষিত পড়ে থাকত। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী খোন্দকার মোশতাক অনেক বছর বেঁচেছিল কিন্তু তার বাড়ি কখনো কারও তরফ থেকে একদিনের জন্য আক্রান্ত হয়েছে বলে শুনিনি। কাজেই, ইতিহাসের শিক্ষা মাথায় রেখে সরকারের উচিত ‘সরকারি লোকদের’ হাত থেকে আওয়ামী লীগকে বাঁচানো। আওয়ামী লীগের উচিত নিজেদের অস্তিত্বের স্বার্থে দেশে গণতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখা। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, আওয়ামী লীগের প্রাণ-ভোমরা জনগণের হাতে। এ দেশে গণতন্ত্র বাঁচলে আওয়ামী লীগও বাঁচবে।

হলেখক : কথাসাহিত্যিক (ডেস্ক)