(দিনাজপুর২৪.কম) নাটোরের বড়াইগ্রাম বনপাড়ায় দিনদুপুরে সুনীল গোমেজ নামে ষাটোর্ধ্ব এক মুদি ব্যবসায়ীকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। গতকাল বেলা ১২টার দিকে বনপাড়া খ্রিষ্টান পল্লীর মা মারিয়া গির্জার পশ্চিম পাশে এ ঘটনা ঘটে। ওদিকে সুনীল গোমেজকে হত্যার ‘দায় স্বীকার’ করেছে আইএস। মধ্যপ্রাচ্যের এ গ্রুপটির নিজস্ব বার্তাসংস্থা আমাক এজেন্সির বরাতে এ খবর দিয়েছে বিশ্বব্যাপী জঙ্গি তৎপরতা পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা সাইট ইন্টিলিজেন্স। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এ সংস্থার টুইটার অ্যাকাউন্টে এ সংক্রান্ত একটি টুইট বার্তাও দেয়া হয়েছে।
ওদিকে ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে পুলিশ নিহতের বাড়ির ভাড়াটিয়া ট্রাকচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন সবুজ নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছে।  মামুন লালপুর উপজেলার কদিমচিলান গ্রামের শফিকুল ইসলামের ছেলে। আইএস এ হত্যার দায় স্বীকার করার খবরে  এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। নড়েচড়ে বসেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পুলিশ ও এলাকাবাসী জানায়, প্রতিদিনের মতো সুনীল গোমেজ বাড়ি থেকে বের হয়ে সকালে গির্জায় যান প্রার্থনার জন্য। প্রার্থনা সেরে তিনি সকাল ৮টার দিকে বাড়ির সঙ্গেই মুদি দোকান খুলেন। বেলা ১২টার দিকে স্থানীয় এক ব্যক্তি দোকানে পণ্য কিনতে গিয়ে দেখেন রক্তাক্ত অবস্থায় সুনীল গোমেজের মৃতদেহ দোকানের ঝাঁপের নিচের দেয়ালের ওপর ঝুলে আছে। তার হাতের মুঠিতে কিছু টাকা। তার ঘাড়, পিঠসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে দুর্বৃত্তরা খদ্দের বেশে এসে তাকে হত্যা করে পালিয়ে গেছে। তার ঘাড়ে একই জায়গায় ধারালো অস্ত্রের কয়েকটি কোপের গভীর ক্ষত রয়েছে। ঘটনার পর র‌্যাব-৫ এর সিও মাহবুব আলম, নাটোরের পুলিশ সুপার শ্যামল কুমার মুখার্জি, ইউএনও মো. রুহুল আমিন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মুন্সী শাহাবুদ্দীন, সিআইডি ইন্সপেক্টর সেকেন্দার আলী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। এব্যাপারে সুনীল গোমেজের একমাত্র মেয়ে স্বপ্না জানান, তার মা কমলা গমেজ সাতদিন আগে চাটমোহরে বাবার বাড়িতে বেড়াতে যান। আর স্বপ্না নিজে স্বামীর বাড়িতে থাকায় ঘটনার সময় বাড়িতে পরিবারের কোনো সদস্য ছিলেন না। তবে তার ভাষ্যমতে  ষাটোর্ধ্ব এই বৃদ্ধের সঙ্গে কারো কোনো শত্রুতা ছিল না। তারপরেও এই ধরনের হত্যাকাণ্ডে নির্বাক তারা। এখন তারা আতঙ্কে আছেন। খ্রিষ্টান পল্লীর পুরোহিত ফাদার হিউবার্ট রিবেরু  বলেন, এ রকম একজন নিরীহ লোকের হত্যাকাণ্ডে আমরা বাকরুদ্ধ। তার প্রশ্ন কেন এমন বৃদ্ধ, শান্তিপ্রিয় একজন মানুষকে হত্যা করা হলো? এ ঘটনায় আমরা স্তব্ধ, নির্বাক। এব্যাপারে বনপাড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এসআই আশরাফ জানান, সুনীল গোমেজকে কুপিয়েই হত্যা করা হয়েছে। তবে কারা এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সে বিষয়ে এখনও পরিষ্কার নয়। স্থানীয় লোকজন কাউকে হত্যা করতে দেখেনি। পুলিশ বিষয়টি নিয়ে খোঁজ খবর চালিয়ে যাচ্ছে। সিআইডি ইন্সপেক্টর সেকেন্দার আলী বলেন, প্রাথমিকভাবে ব্যবসা সংক্রান্ত মনে হলেও সামপ্রতিক হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে এ হত্যাকাণ্ডের সাদৃশ্যতার মিল থাকায় বিষয়টি তাদেরকেও ভাবিয়ে তুলেছে। তাই এর সঙ্গে কোনো জঙ্গি সম্পৃক্ততা আছে কিনা তা মাথায় রেখেই তদন্তকাজ চলছে। হত্যাকাণ্ডের এলাকা সংরক্ষণ ও আলামত সংগ্রহ করেছে সিআইডি। এদিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শনকারী নাটোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মুনশী সাহাবুদ্দিন বলেন, তিনি ঘটনাস্থলে রয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে পরিবারের লোকজন, আত্মীয়স্বজন ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে তারা তেমন কিছুই জানাতে পারছেন না। কি কারণে এ ঘটনা ঘটেছে তা এখনও উদ্ঘাটন করা সম্ভব হয়নি। চাঁদাবাজি সংক্রান্ত কোনো ঘটনা থাকতে পারে বলে প্রাথমিক ভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তার মতে আইএস বা কোনো জঙ্গি সম্পৃক্ততা তারা এখনও খুঁজে পাননি।
ওদিকে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে উপজেলা ও জেলার সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে। বিকাল সাড়ে ৫টায় বনপাড়া পৌর শহরের প্রধান সড়কে এক প্রতিবাদ সমাবেশ ও মানববন্ধন হয়। এতে কয়েকহাজার মানুষ অংশ নেয়। মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন পৌর মেয়র কে এম জাকির  হোসেন,  জয়বাংলা সামাজিক আন্দোলনের চেয়ারম্যান ডা. সিদ্দিকুর রহমান, বনপাড়া ধর্মপল্লীর পাল-পুরোহিত ফাদার বিকাশ হিউবার্ট, বনপাড়া ক্রেডিট ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বাবলু রেনেতোস কোড়াইয়া,  প্যারিস প্রধান বেনেডিক্ট গোমেজসহ স্থানীয় খ্রিষ্টান সম্প্রদায় ও নাটোরের হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান পরিষদের নেতৃবৃন্দ। বনপাড়া খ্রিষ্টান ক্রেডিট ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বাবলু রেনেতোস কোড়াইয়া বলেন, আমাদের জানা মতে তার কোনো শত্রু নাই। সে অতি শান্ত ও নম্র প্রকৃতির একজন প্রবীণ ব্যক্তি। তাকে হত্যা করার কোনো কারণ আমরা খুঁজে পাচ্ছি না।  -ডেস্ক