(দিনাজপুর২৪.কম) ফেব্রুয়ারিতে নিউ ইয়র্ক ফেডে রক্ষিত বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে চুরি হওয়া ৮১ মিলিয়ন ডলার উদ্ধারে ফেড, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সুইফট কর্তৃপক্ষের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। মঙ্গলবার নিউ ইয়র্কে সব পক্ষের প্রতিনিধিরা এ আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন। নিউ ইয়র্ক ফেডের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘ফেব্রুয়ারির ঘটনাবলির প্রযুক্তিগত দিক বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে, যাতে করে ওই প্রতারণার ঘটনা কীভাবে ঘটেছে তা নিয়ে সব পক্ষের বোঝাপড়া আরো বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি, এ ঘটনার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এবং নিউ ইয়র্ক ফেডে বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টকে দীর্ঘমেয়াদে স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফেরাতে যেসব পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে ও হবে, তা নিয়েও আলোচনা করা হয়।’
বিবৃতিতে আরো বলা হয়, ‘অংশগ্রহণকারী সব পক্ষ এ ঘটনায় এখনও উদ্বিগ্ন। প্রতারণার দরুন হারানো সমুদয় অর্থ যত দ্রুত সম্ভব উদ্ধারে একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার বৈঠকে পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।’ ভিন্ন ভিন্ন দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতায় দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা এবং এ ধরনের ঘটনা থেকে বৈশ্বিক আর্থিক কাঠামোকে সুরক্ষিত রাখতে বহুপক্ষীয় আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টায় সমর্থন দানের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে বিবৃতিতে।
হ্যাকারদের পেমেন্ট অর্ডারে ছিল বহু অসামঞ্জস্যতা
ফেব্রুয়ারিতে নিউ ইয়র্ক ফেডে রক্ষিত বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে ৮১ মিলিয়ন ডলার চুরি করতে বেশ কয়েকটি ভুয়া অর্ডার পাঠায় হ্যাকাররা। একটি অর্ডারে ‘কনসাল্টিং ফি’ হিসেবে ২০ মিলিয়ন ডলার ট্রান্সফার করতে বলা হয়। আরেকটি অর্ডারে ‘ইনএলিজিবল এক্সপেন্সেস’ দেখিয়ে ৩০ মিলিয়ন ডলার ট্রান্সফার করতে বলা হয়। অবকাঠামো প্রকল্প, ভেড়ামারা বিদ্যুৎ কেন্দ্র উন্নয়ন, বাংলাদেশ সেতু নির্মাণ ও মাস ট্রানজিট ঢাকা নামক প্রকল্পের নামে যথাক্রমে ৬, ২০, ২৫ ও ৩০ মিলিয়ন ডলার ট্রান্সফার করতে বলা হয়। এমন আরো অনেক অর্ডারে বিভিন্ন অস্পষ্ট খাত দেখিয়ে কোটি কোটি ডলার ফিলিপাইনের মুষ্টিমেয় লোকের কাছে পাঠাতে বলা হয়। ব্যয়ের খাত হিসেবে আরো উল্লেখ করা হয় টিউশন, বন সংরক্ষণ, সাবস্ক্রিপশন ও প্রাথমিক স্তরের সামরিক প্রশিক্ষণের কথা। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে এসব উঠে এসেছে।
খবরে বলা হয়েছে, এসব ভুয়া পেমেন্ট অর্ডারে ফরম্যাটিং (বিন্যাস), বানান ভুল ও সাধারণ বোধের অভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। অথচ, এরপরও ৮১ মিলিয়ন ডলার হাতিয়ে নিতে সক্ষম হয় হ্যাকাররা। পাশাপাশি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে ব্যক্তিবিশেষের অর্থ পরিশোধ করাটাও প্রচলিত নিয়মের ব্যত্যয়। এমন আরো অসামঞ্জস্য রয়েছে। যেমন, হ্যাকাররা প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার ট্রান্সফারের অর্ডার পাঠায়। অথচ, তখন অ্যাকাউন্টে রক্ষিত ছিল মোটে ১.৪ বিলিয়ন ডলার।
অল্প ক’টি বাদে বেশিরভাগ অর্ডারই অবশ্য নিউ ইয়র্ক ফেড বাতিল করে। কিন্তু তাতেই চুরি হয়ে যায় বিপুল পরিমাণ অর্থ। এ ঘটনায় বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার হর্তাকর্তা হিসেবে নিউ ইয়র্ক ফেডের সুনাম ক্ষুণ্ন হয়েছে। পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী অর্থ স্থানান্তরের প্রক্রিয়ায় ত্রুটির থাকার বিষয়টিও প্রকাশ পায়।
ইউনিভার্সিটি অব হিউস্টোনের অধ্যাপক ক্রেইগ পিরং বলেন, ‘ফেড ধরেই নিয়েছে গ্রহীতাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখা যায়। ফলে পেমেন্ট অর্ডার যাচাই-বাছাইয়ের ক্ষেত্রে কেবল আইনি বাধ্যবাধকতার দিকেই ছিল ফেডের নজর। কেউ একজন এ দুর্বলতা চিনে ফেলেছে।’
চুরির ঘটনার পর নিউ ইয়র্ক ফেড বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টটি পরিচালনায় আরো কড়াকড়ি আরোপ করেছে। পাশাপাশি পেমেন্ট অর্ডার আরো ঘনিষ্ঠভাবে পর্যালোচনা করছে।
খবরে বলা হয়, ৪ঠা ফেব্রুয়ারি কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বাংলাদেশ ব্যাংকের নামে ৭০টি ভুয়া অর্ডার যায় নিউ ইয়র্ক ফেডে। এগুলোর প্রায় অর্ধেক অবশ্য পুনরায় পাঠানো হয়েছিল। কেননা, প্রথম ধাপেরগুলোতে ফরম্যাটিং ত্রুটি থাকায় ফেড প্রত্যাখ্যান করে। ৭০টির মধ্যে ৬৯টি অর্ডারে বিপুল পরিমাণ অর্থ ম্যানিলা বা আশপাশের ব্যক্তিবিশেষের কাছে পাঠাতে বলা হয়েছে। পরে জানা যায়, বাস্তবে এদের কোনো অস্তিত্বই নেই।
নিউ ইয়র্ক ফেডে বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈধ পেমেন্ট অর্ডারেও অনেক সময় বানান ভুল ছিল। আবার ব্যক্তিবিশেষের কাছে অর্থ পাঠানোর নজিরও বিরল নয়। যেমন, আইভরি কোস্টে অবস্থিত শান্তিরক্ষী মিশনে এক সেনা কর্মকর্তার কাছে টেলিফোন বিল হিসেবে ৭২৩ ডলার পাঠানো হয়। কিন্তু হ্যাকারদের পাঠানো অর্ডারগুলোতে ব্যক্তিপ্রতি লাখ লাখ ডলার পাঠাতে বলা হয়। আবার একই ব্যক্তির কাছে একাধিকবার টাকা ট্রান্সফার করতে বলা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র শুভঙ্কর সাহা বলেন, ‘সাধারণ লেনদেনের সঙ্গে তুলনা করলে এ লেনদেনসমূহ ছিল অস্বাভাবিক।’
সুইফটের মাধ্যমে নিউ ইয়র্ক ফেডে যাওয়া পেমেন্ট অর্ডারের ফরম্যাটিং ত্রুটি আছে কিনা তা কমিপউটার স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাচাই করে। এছাড়া অবরোধ বা নিষেধাজ্ঞা ও অর্থ-পাচারের বিষয়গুলোও স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাচাই করা হয়। কিন্তু কোনো অ্যাকাউন্টকে খুবই ঝুঁকিপূর্ণ মনে না হলে, আলাদাভাবে ব্যাংকের কর্মকর্তারা এসব যাচাই করেন না। অন্যথায়, কমিপউটারের স্বয়ংক্রিয় যাচাই-বাছাইয়ের পরই অনুমোদিত হয়ে যায় লেনদেন। নিউ ইয়র্ক ফেডের অ্যাকাউন্ট চুক্তিতে স্পষ্টভাবে বলা আছে, ব্যাংকটির কমিপউটার স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘অর্থ প্রেরণ, পেমেন্টের বিষয়বস্তু বা অন্যান্য নির্দেশনা’ যাচাই করে না।
তবে চুরির ঘটনার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট পরিচালনায় কঠোরতা অবলম্বন করছে নিউ ইয়র্ক ফেড। ক্ষেত্রবিশেষে ফোনকলের মাধ্যমে অর্ডার পাঠানোর বিষয়টি নিশ্চিত করা হচ্ছে। এর ফলে মাঝেমাঝে কিছু বৈধ লেনদেনও দেরি হয়। যেমন, ১১ই এপ্রিল চীনের জিও-ইঞ্জিনিয়ারিং কর্পের কাছে একটি পানি সরবরাহ প্রকল্পের জন্য ৮৭ লাখ ডলার ট্রান্সফার করতে পেমেন্ট অর্ডার পাঠায় বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু এ অর্ডার আটকে দিয়ে নিউ ইয়র্ক ফেড বাংলাদেশের কাছে প্রকল্পের ব্যাপারে আরো তথ্য চেয়ে বার্তা পাঠায়। আবার বাধাবিঘ্নের বিষয়ও ফুটে উঠছে। যেমন, ৯ই জুন বাংলাদেশ ব্যাংকের দুই কর্মকর্তার কাছে পাঠানো এক চিঠিতে ব্যাংকের নতুন নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ‘টেকসই নয়’ বলে অভিযোগ করে নিউ ইয়র্ক ফেড। লেনদেন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিরপেক্ষ কাউকে দিয়ে যাচাই করতেও বাংলাদেশ ব্যাংককে জানিয়ে দেয় ফেড।
তবে খবরে বলা হয়েছে, হ্যাকারদের ভুয়া পেমেন্ট অর্ডারগুলোতে অসামঞ্জস্যের বিষয়টি নিউ ইয়র্ক ফেড নিজেরাও আবিষ্কার করে। ফরম্যাটিং ত্রুটি ও অন্যান্য কারণে কমিপউটার কিছু অর্ডার আটকে দেয়। তখন ব্যাংক কর্মকর্তারা সেগুলো যাচাই করেন। ৫ই ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে পাঠানো এক বার্তায় ফেড কর্মকর্তা প্রাপকের ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে চায়। ওই কর্মকর্তা জিজ্ঞেস করেন, ‘পেমেন্ট অর্ডারে বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ ও সুদ পরিশোধের কথা বলা হলেও, প্রাপক কেন ব্যক্তি?’ পরে জানা যায়, বাংলাদেশে সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় কেউই ওই বার্তার জবাব দিতে পারেননি। আবার বাংলাদেশে ছুটির দিন শেষ হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রে ছুটির দিন শুরু হয়। ফলে বাংলাদেশ থেকে পাল্টা জবাব দিয়ে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও, নিউ ইয়র্ক ফেডে কেউই ছিলেন না। কিন্তু চুরির পর সপ্তাহের প্রতিটি দিন ২৪ ঘণ্টা যোগাযোগের জন্য হটলাইন স্থাপন করেছে ফেড। -ডেস্ক