(দিনাজপুর২৪.কম) অঘোষিত পরিবহণ ধর্মঘটে সার্বিকভাবে দেশের সব সেক্টরে যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তা টাকার অঙ্কে নিরূপণ করা সম্ভব নয়। এ ধর্মঘটের ফলে দেশের অর্থনীতিতে বড় একটা ধাক্কা লেগেছে। এফবিসিসিআই, বিজিএমইএ ও পরিবহণ নেতৃবৃন্দ সার্বিক বিশ্লেষণ শেষে এমন মন্তব্য করেন। সমাজবিজ্ঞানী প্রফেসর মাসুদা এম রশীদ চৌধুরী বলেন, সকল ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেই পরিবহণ সেক্টর একটা বড় ফ্যাক্টর। পরিবহণসংকটে মানুষ যাতায়াত করতে না পারলে যে কর্মঘণ্টা নষ্ট হয় তা টাকার অঙ্কে নিরূপণ করা সম্ভব নয়। এছাড়া পণ্য আনা-নেয়া, মানুষের অফিস-আদালত সবকিছুর সঙ্গেই পরিবহণের বিষয়টি জড়িত। একজন ব্যবসায়ী না হয় নিজের গাড়িতে করে অফিস করতে পারেন। কিন্তু তার উৎপাদিত পণ্য যদি সময়মতো ডেলিভারি না হয়, কিংবা পচনশীল পণ্য যদি দুদিন একই জায়গায় পড়ে থাকে তাহলে বিষয়টি কি দাঁড়ায়। তখন শুধু ব্যক্তিই অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন না। এর প্রভাব পড়ে জাতীয়ভাবে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ গতকাল বলেন, সমিতির অধিভুক্ত যানবাহনের সংখ্যা তিন লাখ। এর মধ্যে এক লাখ বাস ও মিনিবাস। বাকি দুই লাখ অন্যান্য পরিবহণ। চল্লিশ হাজারের মতো বাস চলে দূরপাল্লা ও আন্তঃজেলা রুটে। তিনি বলেন, গত ৮ দিনের ছাত্র আন্দোলন ও অবরোধকালে ৮টি যানবাহন পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। ওই কদিনে ভাঙচুর হয়েছে ৪ শতাধিক বাস। অবরোধকালে পরিবহণ খাতে কি পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে টাকার অঙ্কে তা এখনো নিরূপণ করা হয়নি। ওই সময় বাস বন্ধ থাকলেও সব রুটেই ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহন অব্যাহত ছিলো। এনায়েত উল্লাহ তাৎক্ষকিভাবে টাকার অঙ্কে ক্ষয়ক্ষতির কথা উল্লেখ না করলেও সেকুল নামে এক পরিবহণ মালিক বলেন, একটি বাস বসে থাকলে দৈনিক ২০ হাজার টাকা আয় বন্ধ থাকে মালিক-শ্রমিকদের। সে হিসেবে পরিবহণের একটি অংশ শুধু বাস থেকেই দৈনিক ৮০ কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। আর পণ্যবাহী ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও পিকআপ বন্ধ থাকলে দৈনিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় শতকোটি টাকার ওপর। সেকুল বলেন, গত ৮ দিনের পরিবহণ ধর্মঘটে না হলেও এ খাতেই হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে সব সেক্টরে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ মালিক সমিতির কার্যকরি সভাপতি এবং বাংলাদেশ ট্রাক কাভার্ডভ্যান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক রুস্তুম আলী খান বলেন, ধর্মঘটের কারণে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এ মুহূর্তে নির্ণয় করা সম্ভব নয়। অনুমাননির্ভর নয়। অনুভবের বিষয়। তিনি বলেন, ৩ লাখ ১০ হাজারের ওপর শুধু পণ্য পরিবহণের গাড়ি রয়েছে। যা নিকট দূরত্বে যাতায়াত করে। এ ছাড়া ভারী যানবাহনতো রয়েছেই। অবরোধকালে এসব পরিবহণের সামান্য কিছুই চলতে পেরেছে। ঢাকার ভেতর তো চলেইনি। পরিবহণ সেক্টরের সাথে লাখ লাখ শ্রমিক জড়িত। তাদেরতো ক্ষতি হয়েছেই। ব্যবসায়ীদের ক্ষতি পুশবেন কীভাবে। দেশের ব্যবসায়ীদের সবচেয়ে বড় সংগঠন এফবিসিসিআইর প্রেসিডেন্ট শফিকুল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, হঠাৎ করেই অস্থির পরিবেশ এবং পরিবহণ ধর্মঘট যেন ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বড় একটা ধাক্কা। তিনি বলেন, এ মুহূর্তে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করবেন কীভাবে? আমরা কোনো জিনিস রপ্তানি করার আগে বিদেশ থেকে মেটারিয়াল আমদানি করি। এর পর ওই মেটারিয়াল দিয়ে উপযুক্ত পণ্য তৈরি করে তবেই রপ্তানি করি। পরিবহণ ধর্মঘট থাকলে পোর্ট থেকে কোনো পণ্য খালাস হয় না। আবার রপ্তানি পণ্য দ্রব্য সময়মতো সরবরাহ করতে না পারলে বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যায় ব্যবসায়। এটা অন্য কেউ বুঝতে পারবে না। ভুক্তভোগীরা জানেন ক্ষতিটা কোথায়। শফিকুল ইসলাম আরও বলেন, আমরা কোনো ধরনের অবরোধ ধর্মঘট চাই না। চাই না কোনো ধরনের নৈরাজ্য দেখতে, দেশটা এগিয়ে যাচ্ছে। অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছে। এটা যেন কোনো কারণে বাধাগ্রস্ত না হয় এটুকু প্রত্যাশা করি। এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী বলেন, পরিবহণ মালিক শ্রমিকরা ধর্মঘট ডেকেছে। পরিবহণ বন্ধ রেখেছে। তাদেরতো কোনো অসুবিধা নেই। বিভিন্ন দোহাই দেখিয়ে ভাড়া বৃদ্ধি করে তাদের ক্ষতি পুষিয়ে নেবে। কিন্তু আমরা যারা আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে পাল্লা দিয়ে ব্যবসা করি। আমাদের ক্ষতি কীভাবে পূরণ করবো। সময়মতো পণ্য শিপমেন্ট করতে না পারলে চালান গায়েব। তিনিও কথায় কথায় বিনা অজুহাতে ধর্মঘটের মতো কর্মসূচি চিরদিনের জন্য বন্ধ করার আহবান জানান। প্রয়োজনে অবরোধ-হরতালের মতো কর্মসূচি আইন পাস করে চিরদিনের মতো বন্ধ করারও দাবি তার। ঢাকা চেম্বারের এক গবেষণায় দেখা যায়, গাড়ি না চলায় প্রতিদিন কৃষি খাতে ২৮৮ কোটি, পোলট্রিতে ১৮ কোটি ২৮ লাখ, হিমায়িত খাদ্যে ৮ কোটি, পরিবহণ ও যোগাযোগ খাতে ৩শ কোটি, পর্যটনশিল্পে ২শ কোটি, আবাসনে ২৫০ কোটি, শপিং কমপ্লেক্সসহ দোকানপাটে ১৫০ কোটি, প্লাস্টিক পণ্যে ১৭ কোটি ৮৫ লাখ, বিমা খাতে ১৫ কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। এছাড়া অবরোধের ফলে চট্টগ্রাম ও মংলা থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিল্পকারখানায় কাঁচামাল সরবরাহও বিঘিœত হয়। বিভিন্ন স্থলবন্দর থেকে ব্যবসায়ীরা আমদানি পণ্য খালাস করতে না পারায় প্রতিদিন ক্ষতি হচ্ছে অন্তত ১০ কোটি টাকা। ব্যবসায়ীদের মতে, পরিবহণ ধর্মঘটে দেশের সব খাতেই ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে। এরই মধ্যে অনেক বিদেশি বাংলাদেশে তাদের ভ্রমণ বাতিল করেছেন। ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এর প্রভাব পড়বে আসন্ন ঈদুল আজহায়। ২০১৬ সালে কোনো প্রকার হরতাল কিংবা অবরোধ হয়নি। যে কারণে ২০১৫-২০১৬ অর্থবছরে রেকর্ড পরিমাণ ৭.১১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করে। ব্যবসায়ীরা এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরিতে সকলের প্রতি আহ্বান জানান।-ডেস্ক